সাবস্ক্রীপশন ফীঃ

সাবস্ক্রীপশন ফীঃ

বদু একজন খুব সাধারন  মানুষ। আরামবাগে থাকে। অফিসে যায় । পান – সিগারেট খায়। সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে পছন্দ করে। মতিঝিল পুলিশ ফাড়ি এবং আরামবাগের মোড়ে মধুমিতা মিস্টি ঘরে সন্ধ্যায় তাকে পাওয়া যাবে। বিভিন্ন বয়সী এবং ধরনের কিছু মানুষ সব সময় তাকে ঘীরে থাকে। আমি শুনেছি -সে খুব সহজেই সমস্যা সমাধান করে দিতে পারে এবং মজা করে গল্প করতে জানে। সে বয়সে আমাদের একটু ছোট হবে বলেই আমার ধারনা।

এক সন্ধ্যায় আমার বন্ধু প্রতীককে নিয়ে মধুমিতা মিস্টি ঘরে বসে  আড্ডা দিচ্ছিলাম। এমন সময় বদু সাহেবের আগমন ঘটলো। সে একা। প্রতিককে দেখে আমাদের টেবিলে এসে বসলো। আমার সঙ্গে পরিচয়টাও হয়ে গেলো।

বদুঃ ভাই, পারকিং পাওয়া একটা সমস্যা হইয়া দাড়াইছে … বাইকটা রাখলাম ওই চিপায় ।

প্রতীকঃ ফাইন খাইবেন তো ভাই …

বদুঃ  আরে ওই ১২৫ টাকা ফাইন আর কী! দিয়া দিমু নে!

প্রতীকঃ তা অবশ্য ঠিক, কতো টাকাই তো উইড়া যায় এই চা – সিগারেট এর পিছে …

ওদের কথোপকথন চলতে থাকলো। কথা পারকিং ফাইন থেকে শুরু করে পলিটিক্স, ইকোনমি, ধর্ম , মাদক দ্রব্য – সব বিষয়ই ছুয়ে গেলো। আমার কানে সবই ঢুকছিল কিন্তু একই সময়ে তা বেরও হয়ে যাচ্ছিল। আমি ভাবতে শুরু করে দিয়েছি অন্য জিনিস।

ভাবছিলাম- এই বদু ফাইনকে কী সহজেই  সাবস্ক্রীপশন ফী বানিয়ে ফেলল । এরপর থেকে যতোই অব্জারভেশন করতে লাগলাম – ততোই অনেক বেশী করে চোখের সামনে  ফাইনকে সাবস্ক্রীপশন ফী বানিয়ে ফেলার উদাহরন দেখতে থাকলাম- দেশটা যে বদু দিয়ে ভরে গেছে সেটা বুঝতে আর বাকী থাকল না ।

একটি আদর্শ সমাজের সরকার যখন প্রীভেন্টিটিভ আইন চালু করেন – তখন ফাইনের পাশাপাশি  এর পেছনে একটা ফীলোসফীও কাজ করে … সেটা জাস্ট টাকা আয় করার মেকানীজম – ফাইন চালু নয়; ফীলোসফীটা হচ্ছে মানুষকে  কাজটা যে অশোভন – সে ব্যাপারে অবগত করা। তাই এই সরকার গুলো অনেক টাকা ইনভেস্ট করেন সাধারন মানুষের নৈতীকতা ও সুন্দর মানসিকতা তৈরী করার জন্য -একদম তৃনমূল পর্যায়ে -সুদীর্ঘ পরিসরে।

সাধারন মানুষের নৈতীকতা ও সুন্দর মানসিকতা তৈরী হলে সমাজের একটা মজার দৃষ্টিভঙ্গী তৈরী হয়। একজন মিলিয়নার একটি সুন্দর পার্কে ভ্রমন শেষে ইচ্ছে করলে পানির বোতলটা মাঠে ফেলে দিয়ে আসতে পারেন- ফাইন অস্ট্রেলিয়ায় মাত্র ২৬৬ ডলার (যদি ধরা পড়েন), যেটা একজন মিলিয়নার এর জন্য কিছুই না। কিন্তু ধরা পড়ার সম্ভাবনা না থাকলেও ওই মিলিয়নার কিন্তু সেই কাজটা করেন না ।কারন –

১. সরকার ও সমাজের সোশাল ইনভেস্টমেন্টের কারনে তার এই নৈতিকতাটা তৈরী  হয়ে আছে – পার্ক নোংরা করা একটি আশোভন কাজ।

২.  ধরা পড়ার সম্ভাবনা না থাকলেও পার্কের অন্য মানুষ যদি সেটা দেখে ফেলে -তাহলে মান সম্মান আর থাকবে না — আর এই  অশোভন কাজ করাটা যে “আত্ম সম্মানের অন্তরায়” – এই প্রথাটাই হচ্ছে সভ্য জাতীর লক্ষন। টাকা আছে বলে ফাইন দিয়ে দিলাম — আর অশোভন কাজটা করতে থাকলাম – এটা কাজের কথা হতে পারে না -এটা হচ্ছে ফাইনকে সাবস্ক্রীপশন ফী বানিয়ে ফেলা; “জোর যার মুল্লুক তার” – একটি আদীম মনসীকতা।

সাবস্ক্রীপশন ফী হচ্ছে – কোনও সেবা গ্রহন করার বিনিময়ে যে  টাকাটা চার্জ হিসেবে প্রদান করা হয়। বদুর মানসিকতা টা এর একটা দারুন ঊদাহরন। সে ফাইনকে আর ফাইন হিসেবে দেখতে পারছে না- সে প্র্যাক্টীক্যালী যত্রতত্র পারকিং করে বিনিময়ে টাকা দেয়াটাকে পারকিং সেবা গ্রহনের বিনিময়ে ফী প্রদান করা ভাবছে।

ফাইনকে সাবস্ক্রীপশন ফী বানিয়ে ফেলতে থাকলে প্রথমত সেই দেশে কোন আইনের শাসন থাকবে না। কারন সাধারন মানুষের যেহেতু এতদসংলগ্ন ফীলোসফীটা তৈরী হয় নি… যার টাকা আছে- সে অন্যায় কাজ করতে থাকবে এবং বিনিময়ে সাবস্ক্রীপশন ফী প্রদান করতে থাকবে।

দ্বিতীয়তঃ এমন দেশের ন্যায় বিচার ব্যবস্থা অন্যায়ের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে। সরকার যদি পুরোপুরি ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের মতো আচরন করা শুরু করে -তাহলে আর যা ই হউক  বা না হউক – সুশাসন পালিয়ে যাবে।

–সৈয়দ কল্লোল (২০২০)

Leave a comment