ফেরেশতা

এক ফেরেশতার সাথে আমার দেখা হয়েছিল দিনাজপুর রেলস্টেশনে।

প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়েছিলাম ট্রেনের অপেক্ষায়। কোথায় যেন বগি লাইনচ্যুত হওয়ায় ট্রেন আসতে দেরী হচ্ছিল। সময় যত যাচ্ছিলো আমার চিন্তা তত বাড়ছিল, সময়মত ঢাকা যাওয়া আমার খুব দরকার – অনেকদিন পর একটা ভালো জায়গা থেকে ইন্টারভিউ কল পেয়েছি, এটা মিস করলে আফসোসের শেষ থাকবে না। 

দিনটা ছিল স্যাঁতস্যাঁতে, আবহাওয়া বিরক্তিকর। লাইনের ওপর আধমরা ঘাসগুলো ডিংগিয়ে পুরনো লোহার স্ক্র্যাপগুলোর পরে একটা চায়ের স্টলে গিয়ে বসলাম। চা এসে পৌঁছতেই পাশ থেকে কেউ কথা বলে উঠল, যাকে আমি এতক্ষণ লক্ষ্য করিনি।

‘কোথায় যাবেন?’

‘ঢাকা।’

লোকটার চোখে পুরাতন আমলের কালো চশমা। মুখে খোঁচা খোঁচা কাঁচা পাকা দাড়ি আর সাদা পাজামা-পাঞ্জাবী দেখে তাকে এই এলাকার কোন স্কুল মাস্টার বলে ধারণা করলাম।

‘ঢাকায় স্থায়ী?’

‘জ্বী না।’

‘কি করেন?’ – এহেন আরো প্রশ্ন।

ভদ্রতার খাতিরে আমাকেও কিছু প্রশ্ন করতে হল। তখনি জানতে পারলাম যে সে একজন ফেরেশতা, তার নাম হারুত।

‘দেখেন, মিল-ফ্যাক্টরীতে কিছু ইঞ্জিনিয়ার থাকে না মান নিয়ন্ত্রণের জন্য! এদের কাজ কি, জানেন তো! তারা সমস্ত তৈরী জিনিসগুলার মান নিয়ন্ত্রণ করে, গুনাগুন ঠিক রাখে, এমনকি মাঝে মাঝে গুনগুলি কমায়-বাড়ায়। ফেরেশতারা এ ধরণেরই মহাজাগতিক ইঞ্জিনিয়ার, খোদা যাদের নিয়োগ দিয়েছেন – পার্থক্য শুধু এই যে, এই জগতের ইঞ্জিনিয়ার বস্তুর মান নিয়ন্ত্রণ করে, আর ফেরেশতারা মান নিয়ন্ত্রণ করে বিজ্ঞানের সূত্রগুলোর।’

‘ইন্টারেস্টিং’ – বলে আমি একবার ঘড়ির দিকে তাকালাম, আর আধাঘন্টার মধ্যে ট্রেন না আসার অর্থ হলো আমি নদীর ওইপাশে গিয়ে দিনের শেষ গাড়িটা ধরতে পারবো না, অর্থাৎ ইন্টারভিউ পাবার সব সম্ভাবনা শেষ।

লোকটা অবশ্য আমার মনোযোগের তোয়াক্কা করছিলো না, তার মতো কথা বলে যাচ্ছিলো – ‘ফিসিক্স-কেমিস্ট্রির কতগুলি ধর্ম বা সূত্র আছে না! খোদার নির্দেশে এগুলো রক্ষা করাই ফেরেশতাদের কাজ। আগুন থেকে যে গরমই লাগবে, বরফ থেকে যে ঠান্ডাই লাগবে – এগুলি নিশ্চিত করবে কে? ফেরেশতারাই তো। পদার্থবিদ্যার এসব মান যদি তারা ঠিক না রাখত তাহলে কি মাঝে মাঝে বরফে মানুষের হাত পুড়ে যেত না!’

‘কথা তো ঠিকই।’ – আমি সায় দিলাম। আমরা দোকানের ছাউনিতে বসে ছিলাম, কিন্তু ভ্যাপসা গরমের প্রভাবটা যেন কমছিলই না।

‘অবশ্য খোদার ফরমাশ অনুযায়ী তারা বস্তুর এই মৌলিক গুণগুলো বদলেও দিতে পারে। আর এভাবেই ইব্রাহীমের জন্য আগুন হয়ে উঠে শীতল। মোজেজাগুলার রহস্যও এটাই।’

আমি ততক্ষনে নিশ্চিত হয়েছি যে কোনো পাগলের পাল্লায়ই পড়েছি। কিন্তু তাকে বিপজ্জনক মনে হলোনা, আর তাছাড়া এখানে বহু লোক আছে ফলে ঝামেলা হবার সম্ভাবনা বলতে গেলে একদমই নেই। 

‘কিন্তু মানুষ বিশ্বাস করে না।’ – সে বলে চললো – ‘দৃশ্যমান জগৎটা আসলে সমুদ্রের মত, সমুদ্রের বাইরেও কিন্তু একটা জগৎ আছে, সেটা বিশাল, সমুদ্রের চেয়েও। সমুদ্রের প্রাণীরা চিন্তাও করতে পারে না যে সমুদ্রের ভেতরের পরিবেশকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকে মাটির নিচের মাধ্যাকর্ষণ শক্তি আর আকাশের বাইরের মহাকর্ষ শক্তিগুলো। এমনকি আপনিও হয়তো আমার কথাগুলো পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না।’

‘এর আগে অবশ্য কোন ফেরেশতার সাথে আমার দেখা হয়নি।’ – আমি স্বীকার করলাম, তারপর চায়ের কাপে একটা চুমুক দিয়ে আমি বললাম – ‘তো ফেরেশতা হয়ে আপনি এই স্টেশনে কি করেন?’

তাকে একটু অন্যমনস্ক মনে হলো, কিছুক্ষন চুপ থেকে তারপর বললো – ‘এখানে আমি একজনকে খুঁজতে এসেছি।’

‘কাকে খুঁজতে এসেছেন?

‘অনেক বছর আগে এই স্টেশন থেকেই জোহরা হারিয়ে গিয়েছিলো। জোহরা মানে সেই ডাইনি, যার ছলনায় পড়ে আমাকে আমার পাখা দুটো হারাতে হয়েছিল। সে চলে যাবার পর থেকে প্রায়ই আসি এখানে, হয়তো একদিন তার সাথে আবার দেখা হয়ে যাবে, তখন তার সাথে হিসাব-নিকাশ চুকাতে পারব।’ 

তাকে একটু গম্ভীর মনে হওয়াতে আমি একটু দমে গেলাম, অস্বস্তি ভাবটা কাটানোর জন্য বললাম – ‘আচ্ছা, বুঝলাম আপনি সত্যি সত্যিই একজন ফেরেশতা, সেটার পক্ষে অনেকগুলো যুক্তিও আপনি দেখিয়েছেন, কিন্তু এতো জায়গা থাকতে আপনি বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত শহরে কেন সেটা বলবেন কি?’

‘সত্যি কথা বলতে কি,’ – সে টেবিলের কোণে আঙ্গুল ঘষতে ঘষতে বলে – ‘আপনাকে ঘটনাটা প্রথম থেকেই বলি। নিরানব্বই সালের দিকে আপনাদের এই এলাকায় কিছু চেয়ারম্যান-মাতবর  যখন সালিশের নামে এক গরিব লোককে গ্রামছাড়া করেছিল, তখন আমি রাগ হয়ে বলে ফেলেছিলাম যে এই মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব হতেই পারে না। কথাটা বলেছিলাম আবার ফেরেশতাদের আড্ডায়। আপনি হয়তো জানেন না, দ্বিতীয় আসমানে হয় ফেরেশতাদের এই আড্ডাটা, প্রতিদিন আসরের আজানের পরে হয়। আমি তখন বুঝতে পারি নি – প্রশ্ন করাটাও কখনো কখনো আদবের খেলাফ। কিন্তু আপনি বোধ হয় বিরক্ত হচ্ছেন।’

‘আমি বিরক্ত হচ্ছি না।’ – ফেরেশতাটিকে আশ্বস্ত করলাম আমি। এদিকে আমার আশা তখন সত্যিই শেষ হয়ে এসেছে, কারণ এইমাত্র কাকে যেন বলতে শুনেছি – লাইন মাত্র মেরামত হয়েছে, কিন্তু ট্রেন এখনো অন্তত দুই ঘন্টার দূরত্বে আছে।

‘ফেরেশতাদের শাস্তি মানুষের মত হয় না, তাদের শাস্তি হল পরীক্ষা। আমার পরীক্ষা ছিল এইরকম যে আমাকে মানুষের একটা শরীর দিয়ে এই শহরে পাঠিয়ে দেয়া হবে, আমার যৌবনের টান থাকবে, কিন্তু আমি বিয়ে করতে পারব না। আসল কথা হলো, শরীরের সাথে সাথে যেসব রক্ত গরম আসে, সেগুলো যদি আমি বাগে আনতে পারি, তাহলেই প্রমান হবে যে আমার দাবি ঠিক মানে ফেরেশতারা মানুষের চেয়ে ভালো। তখন আমি আবার উপরের আসমানে ফেরত যেতে পারব।’

‘কঠিন শর্ত, কঠিন পরীক্ষা।’ – আমি মন্তব্য করলাম।

‘কিন্তু জানেন, মানুষের শরীর খুব আজব একটা জিনিস। এখন আমার মনে হয়, আকাশের ফেরেশতাদের যদি শরীর থাকতো, থাকলে ওরাও মানুষের মতোই পাপ করতো।’

‘তার মানে আপনি পাপ করেছিলেন?’ – কিছুটা কৌতূহল হলো বলে জানতে চাইলাম, আমার ধারণা ছিল যে ফেরেশতারা পাপ করতে পারেই না।

সে সরাসরি আমার দিকে তাকালো, প্রথমবারের মতো।

‘শোনেন, আমরা তৈরী হয়েছি আলো দিয়ে আর জ্বীন-শয়তান এরা তৈরী আগুনের ধোঁয়াটে অংশটা দিয়ে। অন্ধকারের মধ্যে আলোই কিন্তু পথ দেখায় মানুষকে, অন্যদিকে আগুন শুধু জ্বালায়, ধ্বংস করে আর দৃষ্টিকে বিভ্রান্ত করে। প্রাকৃতিক এ পার্থক্যগুলোই প্রমাণ করে আমাদের বিপরীত স্বভাব। এভাবে সৃষ্টির আদি থেকে আমরা স্বভাবশত্রু হয়েছি একে অন্যের।

শয়তান প্রথম থেকেই চেষ্টায় ছিল কিভাবে আমাকে ফাঁসানো যায়। শেষে সে তার নিজের মেয়েদের মধ্যে জোহরাকে আমার কাছে পাঠালো সুন্দরী মানুষ সাজিয়ে। তারপর মেয়েটা এক রাতে আমার ঘরে এসে বলল তার যাওয়ার জায়গা নেই, শুধু এক রাত আমার ঘরে থাকবে। আমিও রাজি হলাম। সেই রাতে সে ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে আমার সাথে প্রেম করল, পরদিন সকালে উঠে দেখি আমার আসমানে যাওয়ার পথ বন্ধ হয়ে গেছে।

আর এর পরদিন জোহরাও উধাও হয়ে গেল, স্টেশনের ঠিক এই জায়গাটা থেকে।’ – সে আঙ্গুল উঠিয়ে লম্বা প্লাটফর্মের ডানদিকের বড় একটা কলাম দেখাল – ‘তখনি বুঝলাম জোহরা আসলে একটা ডাইনি ছিল, পুরাটাই শয়তানের একটা চক্রান্ত আসলে, আমাকে আমার পরীক্ষায় ফেল করানোর জন্য চক্রান্ত। কোনদিন বুঝতে পারি নাই ওই বদমাইশ ঘটনা সাজিয়ে এভাবে আমাকে ফাসাবে।’      

আমি একটু থমকে গেলাম। যে জোহরা তাকে এত বড় ধোঁকা দিল, তার খোঁজে এই ফেরেশতাবেশীর প্রতিদিন রুটিন করে স্টেশনে আসার অভ্যাসও আমাকে অবাক করল। মনে হল ডাইনি হলেও মেয়েটার প্রতি কোনভাবে ওর একটা টান তৈরি হয়ে গিয়েছিল। ভাবছিলাম, ফেরেশতা আর পরীর এই প্রেম কাহিনী কসম কেটে বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না।

যেহেতু আমি গল্পের এ ধরণের মোড় পরিবর্তনের জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না, তাড়াতাড়ি প্রসঙ্গ বদলে বললাম – ‘তা আপনি কবে আবার আকাশে ফিরে যাবেন? ভুল শোধরানোর কি কোনোই রাস্তা নেই?’

‘আছে, একটা রাস্তা আছে।’ – তার চোখ জোড়া আবার উজ্জ্বল হয়ে ওঠে – ‘আমার গল্পটা যদি কেউ বিশ্বাস করে আর এটা থেকে শিক্ষা নিতে পারে তাহলে আমার মুক্তি পাবার একটা সম্ভাবনা আছে।’

আমি তার কাঁধে হাত রাখলাম – ‘যান, আমি আপনার কথা বিশ্বাস করলাম।’ আমার এ কথাতে যদি তার মন শান্ত হয়, হোক না – ভাবলাম।

সে দেখি আমার কথায় সত্যি খুব খুশি হলো, মন খুলে হেসে বললো – ‘জানেন, প্রথমবার আপনাকে দেখেই আমার কেন যেন মনে হয়েছিল, আজ আমার একটা সম্ভাবনা আছে। আপনার চোখে আমি দেখেছি সেই আলো যা সাধারণত: দেখা যায় শিশুর সরলতার ভেতর। আমার ধারণা আপনিই কেবল পারবেন আমার কথাগুলো বুঝতে, আর তখনই কেবল আপনি পারবেন এই কথাগুলো সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতে। আর এতেই হয়তো এখানে আমার দায়িত্ব শেষ হবে।’

আমি ওর সাথে কথা চালিয়ে যাচ্ছিলাম ঠিকই, কিন্তু আমার মনটা আসলে পড়ে ছিল ট্রেনেরই চিন্তায়। হয়তো সেটা লক্ষ্য করেই সে বললো – ‘আপনাকে একটু যেন অস্থির অস্থির মনে হচ্ছে, আপনিও কি কাউকে হারিয়ে ফেলেছেন? স্টেশনে কিন্তু ভয়ঙ্কর জায়গা, এখানে প্রায়ই মানুষ হারিয়ে যায়।’

‘না, আমি কাউকে হারাইনি, তবে আমি একটা জিনিস খুঁজছি, আর সেটা হচ্ছে চাকরি।’

‘ও বুঝতে পেরেছি।’ – তাকে একটু আশ্বস্ত মনে হলো, মানুষ খোঁজার সাথে চাকরি খোঁজার আসলেও তো কোনো তুলনা হয় না।

‘কিন্তু ট্রেনটা মনে হয় আজকে মিস হয়ে যাবে।’ – আমি বললাম – ‘কোথায় যেন লাইনে গন্ডগোল হয়েছে, মনে হচ্ছে চাকরিটা হাতছাড়াই হয়ে গেলো। অলৌকিক কিছু না হলে আমার আর কোনো আশা নেই।’

তার মুখ হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, যেন দরকারি কোনো কথা মনে পড়েছে – ‘অলৌকিক কিছু কখনো ঘটে না এটা আপনাকে কে বললো? আমরা ফেরেশতারা তো আছি এসবের জন্যই – আমরা ভালো লোকদের না চাইতেই সাহায্য করি। আপনি একজন ভালো মানুষ, একজন ফেরেশতার সাথে যখন আপনার দেখা হয়ে গেছে তখন আপনার আর কোনো চিন্তা নেই।’

আমি ম্লান হাসি হাসলাম – ‘দুই-তিন ঘন্টার রাস্তা এই ট্রেন মাত্র পনেরো-বিশ মিনিটের মধ্যে কিভাবে পার হয়ে আসবে? আমার মনে হয় অন্য কোনো ব্যবস্থা দেখতে হবে।’

‘আপনি তাহলে আমার কথাটা বিশ্বাস করেননি, যখন খোদা তাদের ক্ষমতা দেন তখন ফেরেশতারা সবই পারে, কারণ তাদের কাজই বিজ্ঞানের সূত্রগুলো সময়মত বদলে ফেলা। অবশ্য আপনার এগুলো বিশ্বাস না করাই স্বাভাবিক, তাছাড়া যুক্তি মেনে চলাটাই মানুষের জন্য ঠিক কাজ। আমরা ফেরেশতারা কিন্তু আবার মানবজাতির যুক্তি আর জ্ঞানকে অনেক শ্রদ্ধার চোখে দেখি।’

আমি ততক্ষনে বিকল্প ব্যবস্থার কথা চিন্তা করা শুরু করেছি। কাছাকাছি একটা বাস স্ট্যান্ড আছে – বাস ধরলে বোধ হয় এখনো আমার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা থাকবে সময়মতো নদীর ঐপারে পৌঁছানোর। মনে মনে হিসাব করার চেষ্টা করলাম বাস বদলে বদলে কতক্ষনে নদীর ওই পাড়ে যাওয়া যাবে।

তখন হঠাৎ ওর কি হলো, চট করে উঠে দাঁড়ালো, তারপর আমাকে একটু বসতে বলে হন্ত-দন্ত হয়ে বাইরে চলে গেলো। আমি পাশে ফেলে রাখা একটা পেপার উঠিয়ে খবরগুলোতে চোখ বুলাতে থাকলাম – লোকাল পেপার, স্থানীয় সব খবর সাজানো বড়ো সাইজের কিছু বিজ্ঞাপনের সাথে।

মিনিট পাঁচেক পরে সে ফিরে এল একদম ঘেমে নেয়ে, কিন্তু মুখে তার দিগ্বিজয়ীর হাসি। হাপাতে হাপাতেই বললো – ‘ভাই, আমার বন্ধুরা একটা কাজের কাজ করেছে, ওরা ট্রেনের যাত্রাপথটাকে ছোট করে দিয়েছে। স্পেস-টাইম নিয়েই ওদের কাজ তো, ওরা এটা পারে। আপনার আর চিন্তা নেই, যে কোনো সময় আপনার ট্রেন আসলো বলে।’

আমি ততক্ষনে বাস ধরার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি, তবু তার সহজ সরল আশ্বাসের কথা শুনতে ভালো লাগছিলো।

সে অবশ্য হাসছিল, কিম্ভূত সে হাসি দেখে বোঝার উপায় নেই যে সে এককালে সপ্তআকাশের ওপরেই কোথাও ছিল। নিখুঁত তার ছদ্মবেশ – আমাকে স্বীকার করতেই হল।

তখনি কোথা থেকে যেন একটা হুঁইসেল কানে এলো, আর আমিও তাকে বসতে বলে চায়ের দোকানের বাইরে একবার উঁকি দিলাম। আশ্চর্য তো! মনে হচ্ছে সত্যিই একটা ট্রেন আসছে। এটা কিভাবে সম্ভব হলো!

আমার অবশ্য তখন এসব নিয়ে ভাবার বিন্দুমাত্র সময় নেই, যেভাবেই হোক ট্রেন তো এসেছে। তাড়াহুড়া করে আবার স্টলে ঢুকলাম চায়ের দাম দেয়ার জন্য – ইতোমধ্যে তিন কাপ চা খাওয়া হয়ে গেছে, সেই ফেরেশতা অবশ্য এর এক কাপও ছোঁয়নি। কিন্তু ভেতরে ঢুকে ওকে কোথাও দেখলাম না।

ওর খোঁজ করব কিনা ভাবছিলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম বাদ দেব, কিন্তু শেষে কি মনে করে স্টলের ম্যানেজারটাকে বলেই ফেললাম ফেরেশতাটির সাথে আমার পরিচয়ের ঘটনাটা। ‘কালাইম্যা পাগলা’কে সে ভালো করেই চেনে, আমি যেন ভুলেও তাকে টাকা-পয়সা না দেই। ‘না, টাকা-পয়সা চায়নি অবশ্য।’ – বললাম আমি। চায়ের দোকানী আরো বলল, কালাম এক সময় স্থানীয় এক স্কুলের ‘মাস্টার’ ছিল, বৌ তাকে রেখে আরেকজনের হাত ধরে পালিয়ে যাওয়ার পর পরই সে মানসিকভাবে অস্থিতিশীল হয়ে যায়।

আমি চায়ের দাম দিয়ে বেরিয়ে এলাম। বাইরে বেশ রোদ, আকাশ থেকে মেঘ সরে যাচ্ছে। আরেকবার প্ল্যাটফর্মে এদিক-ওদিক তাকালাম, কিন্তু কোথাও তাকে দেখা গেল না – একবারের জন্যও না। পরে অবশ্য মনে হল, ও যদি আসলেও ফেরেশতা হয়ে থাকে তাহলে ওর হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়াটা তেমন অস্বাভাবিক কিছু না – ফেরেশতাদের বেলা এমন ঘটনা ঘটতেই পারে। হতেও পারে যে আমি নিজের মনের খুব গভীরে কোথাও তার কথাগুলো বিশ্বাস করেছি, আর আমার বিশ্বাসের শক্তি সত্যি সত্যিই তাকে মুক্তি দিয়েছে – এ জগতের গ্লানি গুলো থেকে।

Leave a comment