১.
সেটা ছিল ফাগুন মাসের গোলাপি রোদের এক বিকেল। নিউমার্কেটের ভেতরে খোলা চত্বরে আমি লাবনীর হাত ধরে হাটছিলাম আর মাঝে মাঝে ওর দিকে তাকিয়ে দেখছিলাম কিভাবে ওর রেশমি চুলগুলো বাতাসে বারে বার ওর ফর্সা গালকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়। বইয়ের দোকানগুলোর সামনে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ে ও যখন আমাকে জিজ্ঞেস করল আমি ওর সাথে প্ল্যানচেটের একটা আসরে যেতে চাই কিনা, আমি রাজি না হয়ে পারলাম না।
লাবনীকে আমি কিছুতেই না বলতে পারি না, বিশেষ করে ও যখন ওর রাশান পুতুলের মত গোলগাল মুখটা তুলে আমার চোখের দিকে তাকায় আর চোখ দুটো বড় করে কোনকিছু বলে ফেলে আমাকে। প্লানচেটের কথা না বলে সে যদি সেদিন বলত – “মামুন, তুমি কি আমার সঙ্গে মঙ্গল গ্রহে যাবে, লটারিতে ইলোন মাস্কের সাথে মঙ্গলে যাওয়ার দুটা টিকিট পেয়েছি”, সাথে সাথে রাজি হয়ে যেতাম, যদিও শুনেছি মঙ্গল গ্রহে অনেক শীত আর আমার আবার অল্পতেই ঠান্ডা লেগে যায়।
লাবনী না হয়ে অন্য কেউ যদি বলতো, তাহলে কোনদিনই আমি এরকম প্ল্যানচেট জাতীয় আসরে যেতে রাজি হতাম না। তাছাড়া এমনও না যে, সেই অভিজ্ঞতা থেকে রহস্য গল্পের নতুন কোন প্লট খুঁজে পাবো আমি। আমি রাজি হয়েছিলাম শুধু এই আশায় যে, প্ল্যানচেট উপলক্ষে লাবনীর সাথে আরেকটা সন্ধ্যা – ভাগ্য ভালো হলে আরেকটা রাত – একসাথে কাটানো যাবে।
লাবনী আমার চেয়ে উচ্চতায় ইঞ্চি দুয়েক ছোট হওয়াতে আমি তখন ওর চুলের পরিপাটি সিঁথিটা দেখতে পাচ্ছিলাম। সে বিকেল ওর গা থেকে আসা পারফিউমের গন্ধ আমাকে বেলি ফুলের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। খামোখাই কথা বাড়াতে ভালো লাগছিল বলে জানতে চাইলাম কার প্ল্যানচেট। সে বলল, ওর বান্ধবী বিলকিসের খালাতো বোন – যার নাম শান্তা – মাত্র উনিশ বছর বয়সে মারা গেছে। এক সন্ধ্যায় জ্বর এলো, পরদিন শেষরাতে মারা গেল, হাসপাতালে নেয়ার সুযোগ পর্যন্ত হল না।
ধরে নিলাম, ওর বাবা-মা অস্থির হয়ে গেছে মেয়ের সাথে কথা বলার জন্য, তাই প্ল্যানচেট জাতীয় অনুষ্ঠান করে মনকে শান্ত করতে চাইছে। কিন্তু লাবনী বলল অন্য কথা, ওরা নাকি প্ল্যানচেট করছে জমির হারিয়ে যাওয়া একটা দলিলের খোঁজে। সেই শান্তাই নাকি দলিলটা আলমারির কোন এক ড্রয়ারে রেখেছিল। ওর বাবা আর চাচা আশা করছে, প্লানচেটের মাধ্যমে শান্তার আত্মার সাথে কথা হলে এক ফাঁকে দলিলের বিষয়টা জেনে নেয়া যাবে।
২.
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মানসিকভাবে পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে আমি আর লাবনী শান্তাদের বাসার দিকে রওয়ানা হলাম। সেই সন্ধ্যায় ঢাকায় অল্প অল্প বৃষ্টি হচ্ছিল, কোথাও কোন লঘুচাপ হয়েছে হয়তো। ঝিরি ঝিরি বৃষ্টির সাথে অল্প বাতাস। রিক্সায় হুড উঠিয়ে দেয়ার কারণে লাবনীর সাথে চাপাচাপি করে বসতে হয়েছিল। কলাবাগান থেকে ধানমন্ডি প্রায় বিশ মিনিটের রাস্তা, প্রায় পুরো রাস্তাই লাবনী মুখ লুকিয়ে হাসল, আমি না দেখার ভান করে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকলাম।
মাঝে-মধ্যে আমরা আসন্ন প্ল্যানচেট নিয়ে টুকটাক কথা বললাম। রিক্সা থেকে নেমে সে আমার হাত ধরল। আমি নিজের ভেতরে হৃৎপিণ্ডের অস্বাভাবিক গতি অনুভব করতে শুরু করলাম। শান্তাদের বাসার যত কাছাকাছি হচ্ছিলাম, ততই ওর হাত আরো শক্ত করে আমার হাত আঁকড়ে ধরছিল। আমি ওকে আশ্বাস দিলাম যে ভয় পাওয়ার কোন কারণ নেই, বললাম – ‘আত্মার বস্তু ধর্ম নেই, তার মানে ওটা তোমার শারীরিক কোন ক্ষতি করতে পারবে না।’
আমি নিজে অবশ্য প্ল্যানচেট বিশ্বাস করি না, আমার ধারণা এগুলো সবই বুজরুকি। পৃথিবী রহস্যময় জায়গা, কিন্তু তার মানে এই না যে প্ল্যানচেট করে সেই রহস্যের অনেকটাই উদ্ঘাটন করে ফেলা যাবে। ফলে আমি অপরিচিত এক ড্রইং রুমে বোকার মত বসে রইলাম। পাশের ডাইনিং রুমে প্ল্যানচেট হবে, সেখানে ঢোকার আগে লাবনী বার বার আমার দিকে তাকাচ্ছিল। এমনকি আমার এও মনে হচ্ছিল যে ভয়ে-আতঙ্কে সে কেঁদেই দেবে। বেতের সোফায় বসে কিছু পত্রিকার পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে আমি পোড়া কর্পূরের গন্ধ পাচ্ছিলাম। আমি নিশ্চিত ছিলাম এর সাথে প্ল্যানচেট নামক অনুষ্ঠানটার সম্পর্ক রয়েছে।
ওই রুমে বসে থাকতে থাকতে তিনদিনের পুরোনো পত্রিকাটাও যখন আদ্যোপান্ত পড়া হয়ে গেল – বিজ্ঞাপনগুলো সহ – তখন একটা এলবাম দেখে সেটা কোলে টেনে নিলাম। জানি, অনুমতি ছাড়া কারো ব্যক্তিগত ছবি দেখা কিছুটা অভদ্রতা, কিন্তু আমার আর কিছু করার ছিল না। তাছাড়া স্পর্শকাতর কোন ফটো নিশ্চয়ই কেউ ড্রইংরুমে ফেলে রাখবে না।
এলবাম ভর্তি ছবি, বেশিরভাগই একটা পরিবারের – মধ্যবয়স্ক লোক, গৃহিনী মহিলা, ষোল-সতর বছর বয়সের একটা মেয়ে, আর দশ-বারো বছরের একটা ছেলে। ধারণা করলাম এই মেয়েটাই শান্তা, যে মারা গেছে। শান্তার কিছু একা ছবিও আছে, স্টুডিওতে আয়োজন করে তোলা। যদিও খুব ভালো করেই জানি, এই মেয়েটা মারা গেছে, আর ওর এই চেহারা এখন মাটির নিচে পচে-গলে একাকার হয়ে গেছে, তবুও আমি ওর ছবিগুলো থেকে চোখ সরিয়ে নিতে পারছিলাম না। বড় বড় টানা চোখ, একহারা গড়ন, উন্নত নাক – আমি সিনেমা ছাড়া কোথাও এত সুন্দর চেহারা দেখিনি। নিজের অজান্তেই এলবামের পাতা একটার পর একটা উল্টিয়ে চলছিলাম, যদি ওর আরো কিছু ছবি খুঁজে পাওয়া যায় !
ভেতর থেকে থেকে থেকে একটা চাপা কান্নার শব্দ আসছিল। শান্তার তথাকথিত আত্মা কি এসেই গেল? নাকি এটা কোন মায়ের বুকে চেপে রাখা কষ্টগুলোর হঠাৎ বেরিয়ে আসা? আমি এলবামটার পাতাগুলো উল্টোদিক থেকে আবার দেখতে শুরু করেছিলাম আর পাশের ঘরে হতে থাকা শব্দগুলোর দৃশ্যায়ন করার চেষ্টা করছিলাম মনে মনে। হঠাৎ একটা গোঙানির মত শব্দে আমি চমকে উঠে পাশের সেই ঘরের দরজার দিকে তাকালাম, আর তখনি চোখে পড়ল একটা মেয়ে আমার সামনের সোফায় বসে আছে।
মেয়েটা হাসল, আমার চোখে চোখ রেখে। আমি একবার ভাবলাম চোখ সরিয়ে নেব, কিন্তু সম্মোহিতের মত আমি ওর দিকেই তাকিয়ে রইলাম, যেন কেয়ামত হওয়া পর্যন্ত ওর আর আমার দৃষ্টি এভাবেই এ ঘরে আটকে থাকবে।
‘না, এটা শান্তা। ও মারা গেছে গত মাসে।’ – সে বলল।
‘তুমি কি ওদের আত্মীয়?’
‘সবাই তাই ভাবে।’
‘তোমার নাম জানতে পারি?’
‘নাম জেনে কি করবেন?’ – আবার ওর হাসি।
‘তোমার সাথে ওর চেহারার অনেক মিল, তাই ভেবেছিলাম তোমার ছবিই দেখছিলাম এখানে।’ – এলবামটা ইঙ্গিত করে বললাম।
‘আমি তো আমিই, আর ও তো ওই। তাই না?’ – বলে সে হঠাৎ আবার চোখ নিচু করে ফেলল।
ওর উত্তরগুলো কেমন হেঁয়ালিভরা লাগছিল। হতে পারে শান্তার কোন খালাতো, মামাতো বা চাচাতো বোন সে – অনেকসময় সমবয়সী ভাই-বোনদের চেহারায় খুব মিল থাকে। আমি এলবামটাও একপাশে রেখে দিলাম, যেন চুরি করে ছবি দেখতে গিয়ে আমি ধরা পড়ে গেছি। অস্বস্তি কাটানোর জন্য বললাম – ‘আমার নাম তারেক, আমি রহস্যপত্রিকার জন্য বিদেশী গল্প অনুবাদ করি। আমার দেখা সবচেয়ে রহস্যময় চরিত্রগুলোর মধ্যে তুমি একজন।’
শেষ কথাটা কেন বললাম আমি নিজেও জানি না। এই অনামিকার সামনে বসে থেকে সেদিন আমার কি যেন হয়েছিল, বাড়তি কথা বলছিলাম। অথচ আমি মেয়েদের বলতে গেলে এড়িয়েই চলি – অবশ্যই লাবনী ছাড়া, ওর কথা তো আলাদা, লাবনীকে তো আমি তো মাঝে মধ্যে এমনকি স্বপ্নের ভেতরও দেখি।
মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে হাসছিল। হয়তো এটাই সৌজন্যতা। আমারও কি হেসে উত্তর দেয়া উচিত? ভেতরের রুমে তখন দুজন মানুষের একসাথে কথা বলার শব্দ আসছে – একটা জোরালো পুরুষ কণ্ঠ, অন্যটা ক্ষীণ নারী কণ্ঠ। আমি বললাম – ‘আমি কি তোমার সঙ্গে পরে যোগাযোগ রাখতে পারি? আসলে আমি গল্প লিখি তো, মানে মাঝে-মধ্যে চেষ্টা করি আরকি। হতেও পারে তোমাকে নিয়ে একটা গল্প ফেঁদে বসলাম।’
মেয়েটা হেসে উঠল – ‘নিশ্চয়ই পারেন।’ তারপরই আবার উঠে দাঁড়াল হঠাৎ – ‘আমাকে উঠতে হচ্ছে, মনে হল আমাকে ভেতরে খুঁজছে ওরা।’
‘তোমার সাথে কিভাবে যোগাযোগ করব? কোন নাম্বার?’ – আমিও ওর দেখাদেখি তখন উঠে দাঁড়িয়েছি।
‘আমার কোন নাম্বার নেই। আপনি আপনার নাম্বার লিখে দিন, দরকারে আমি আপনাকে ফোন দেব।’
আমি তাড়াহুড়া করে পত্রিকার একটা কোনায় আমার মোবাইল নাম্বারটা লিখে ওর হাতে ধরিয়ে দিলাম। কাগজটা হাতের মুঠিতে আটকে ফেলে সে ভেতরে চলে গেল, একবারের জন্যও পেছনে ফিরে তাকালো না। ও চলে যাওয়ার পর আমার মনে পড়ল সে তার নামটি বলে যায় নি।
ও চলে যাবার দুই-তিন মিনিট পর ভেতরে অনেক জোরে কারো কেঁদে ওঠার আওয়াজ পেলাম। এটা একটা মহিলা কণ্ঠ। তারপর একটা মৃদু শোরগোলও শোনা গেল। মনে হল, আত্মা – অথবা যাই-হোক-না-কেন – এসে পড়েছে। আমি আবার মন দিয়ে এলবামের ছবিগুলো দেখতে শুরু করলাম, খুঁজতে লাগলাম ছবি থেকে সেই পরিবারের না-জানা কোন গল্প বেরিয়ে আসে কিনা।
সেরাতে প্রায় সাড়ে এগারোটা পর্যন্ত প্ল্যানচেট চলল। ওরা যখন আসর ভাঙলো, আমি প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। লাবনীর চেহারা দেখলাম নীল হয়ে গেছে। ওকে এটা-ওটা বলে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করলাম, তারপর একটা রিক্সা ডেকে সোজা চলে গেলাম ওদের বাসায়। ওকে দোতলার দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দিলাম, কিন্তু সে আমাকে বিদায় না বলেই ভেতরে চলে গেল। শুনেছিলাম সে রাতে ওর অনেক জ্বর এসেছিল। পরদিন ফোন করে সে আমাকে কসম করে বলেছিল আর কোনোদিন এমন জায়গায় যাবে না।
৩.
সেই সপ্তাহে লাবনীর সাথে আর যোগাযোগ হল না। ধরে নিলাম সে আতঙ্ক কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। শুক্রবারদিন সকাল এগারোটার দিকে অপিরিচিত একটা নাম্বার থেকে ফোন এলো। আমি তখন মাত্র ঘুম থেকে উঠেছি। হয়তো কোন নতুন টুইশনির খবর, আর ঘর ভাড়া দেবার জন্য আমার একটা খুবই দরকার ছিল, তাই তাড়াতাড়ি ফোনটা ধরলাম। কিন্তু ওপাশে কোন কথা নেই। বার বার হ্যালো বলার পর প্রায় শোনা যায় না এমন ভাবে ফিস ফিস করে কেউ বলল – ‘ভালো আছেন?’ – সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা কণ্ঠ এটা, মেয়েলি।
‘কে?’
‘আমি ইরেন্দিনা।’
‘ইরেন্দিনা?’
‘আপনি আমাকে ইরা বলেও ডাকতে পারেন।’
‘আমি কি আপনাকে চিনি?’
‘মনে হয় গত মঙ্গলবার আমাদের কথা হয়েছিল।’
আমি নড়েচড়ে বসলাম। সত্যি কথা বলতে কি, আমি স্বপ্নেও আশা করি নি এরকম আগুনের মতো সুন্দরী কেউ কখনো আমাকে ফোন করে বসবে। আমি কথা বলতে শুরু করলাম। সে বলল সে একটা কলেজে পড়ে, যদিও কলেজের নামটা বলতে ভুলে গেল। সে বলল যে ওর বিজ্ঞান ভালো লাগে, কিন্তু বিজ্ঞানের কোন শাখা ভালো লাগে সেটা বলতে ভুলে গেল। সে বলল ওর বাবা-মা অন্য শহরে থাকে, কিন্তু বলতে ভুলে গেল ওর সেই অন্য শহরের নাম-ঠিকানা। ও বলল এখানে এক দূর সম্পর্কের আত্মীয়ের বাসায় নাকি আপাতত থাকছে সে। সেদিন আমরা কথা বললাম পুরো একটা ঘন্টা।
সেদিন ইরেন্দিনার সাথে কথা বলে আমার মনে হল, আমার আত্মার ভেতর কোথাও একটা শূন্যতা ছিল, আর ওর কণ্ঠ প্রতি মুহূর্তে সেই শূন্যতা একটু একটু করে পূরণ করে করে দিচ্ছিল। ওর বক্তব্যগুলো ছিল দৃঢ় কিন্তু কণ্ঠ ছিল কোমল, ওর বাক্যগুলো ছিল স্পষ্ট কিন্তু শব্দগুলো ছিল প্রায় শোনা যায়না এরকম নিচুলয়ের। পুরোটা সময় যেন আমি ঘুমের ঘোরে ছিলাম, ফোন রেখে দেয়ার পর পুরো ব্যাপারটাই স্বপ্ন বলে মনে হল।
এদিকে পরদিন ছিল শনিবার, ছুটির দিন। লাবনী ফোন করে বলল সে বিকেলে ধানমন্ডি লেকের ওখানে হাটতে যাবে। সে জানতে চাইলো আমি যেতে চাই কিনা। আমি যথারীতি হ্যা বললাম, তারপর বাধ্য ছেলের মতো সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলাম আধঘন্টার মধ্যে। সেদিন পার্কে বাতাস ছিল সজল, ঝির ঝির করে কাঁপতে থাকা গাছের পাতাগুলো ছিল সজীব।
সেদিন কথায় কথায় লাবনী বলল, প্লানচেটের সূত্র ধরে শান্তার বাবা ওই দলিল খুঁজে পেয়েছে। শান্তার ‘আত্মা’ সেরাতে ড্রয়ারের যে জায়গার কোথা বলেছিল, ঠিক সেখানেই ওটা খুঁজে পাওয়া গেছে। খবরটা পেয়ে আমি বেশ দ্বিধান্বিত হয়ে পড়লাম, যদিও লাবনীকে সেটা বুঝতে দিলাম না। ওকে দেখে মনে হলো এ ঘটনায় সে একেবারেই অবাক হয় নি, যেন এরকমটাই হওয়ার কোথা ছিল।
লেকের ধারের কংক্রিটের বেঞ্চে বসে সে বিকেলে লাবনী এডগার এলান পোর গল্পের রহস্যময়তা নিয়ে আলাপ করল, সে নাকি ইদানিং বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রে গিয়ে সব অনুবাদ সাহিত্য পড়া শুরু করেছে। আমি বললাম, আমার পছন্দ আইজাক সিঙ্গার, কারণ ভদ্রলোক রহস্যগল্প লিখে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এভাবে আমরা সেদিন ‘আজেবাজে কথা’ বলে সময় নষ্ট করা থেকে বিরত থাকলাম, আলাপ শেষে রাস্তার পাশে বসে একসাথে চা খেলাম। ফেরার সময় আমার মনে হল এটাই বোধ হয় সম্পর্কের পূর্ণতা, অনর্থক আলোচনা থেকে জিহবা আর কানের যুগপদ মুক্তি।
বাসায় ফেরার পর কিছুক্ষন ‘আধুনিক দর্শন’ নামে পাঠ্য একটা বই পড়ার চেষ্টা করলাম, কিন্তু মাথায় কিছু ঢুকছিলনা বলে ঘুমানোর প্রস্তুতি শুরু করলাম। আর তখনি দেখি আবার ইরা ফোন করেছে। আমি কথা বলা শুরু করলাম, কথা বলতে বলতে একপর্যায়ে হিসাব করতে ভুলে গেলাম কোনটা ‘আজেবাজে কথা’ আর কোনটা ‘দরকারি কথা’। ফোন রাখার আগে বললাম – ‘তুমি কি জানো, তোমার নাম একটা বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস আছে?’
‘তাই নাকি?’ বলে সে হাসতে শুরু করল, আমি এপাশ থেকে কল্পনা করতে চেষ্টা করলাম হাসিতে ওকে কেমন দেখাচ্ছে।
‘হ্যা, লেখকের নাম গার্সিয়া মার্কেজ। তুমি মার্কেজের নাম শুনেছ?’
ওপাশে আবার হাসি। আমি বিদায় বললাম, কিন্তু ফোন রেখে দেয়ার পরও অনেকক্ষণ কানে বেজে চলল ওর সেই রিনরিনে হাসির ছন্দ।
৪.
এরপর থেকে প্রায়ই আমার ইরার সাথে ফোনে কথা হতো। ও ফোন করত সকাল এগারোটার দিকে, এসময়টা আমি সাধারণত ঘুম থেকে উঠি। অথবা সে ফোন দিত রাত বারোটার পর, যখন আমি সাধারণত ঘুমের প্রস্তুতি নিই। আমি লক্ষ্য করলাম, যেদিন সকালে সে ফোন করে সে দিনটা আমার খুব ভালো যায়, রিক্সাওয়ালা পর্যন্ত অল্প ভাড়ায় ভার্সিটিতে যেতে রাজি হয়ে যায়। আর যেরাতে সে ফোন করে, সে রাতে আমি সারারাত সুন্দর সুন্দর সব স্বপ্ন দেখে কাটাই। হতেও পারি ওর সাথে সৌভাগ্যের কোন সম্পর্ক আছে – মনে মনে ভাবি আমি।
ওর সাথে গল্প-গুজবের এই দিনগুলোতে আমি একসময় আবিষ্কার করলাম, ইরা রহস্যময় জিনিস আর অদৃশ্যের জগৎ নিয়ে আলোচনা করতে পছন্দ করে। যেমন একদিন সে বলল, তার ধারণা জীন জাতি শক্তি দিয়ে তৈরী। সে আমাকে বুঝিয়ে বলল তার হাইপোথেসিস – মানুষ আর জীনের মূল উপাদান হচ্ছে আত্মা, মানুষের আত্মা নিয়ন্ত্রণ করে ম্যাটার অর্থাৎ বস্তুর তৈরী একটা শরীরকে, অন্যদিকে জীনের আত্মা নিয়ন্ত্রণ করে এনার্জি অর্থাৎ শক্তির তৈরী অন্য একধরণের একটা শরীরকে।
‘মানুষের জন্য আটার দলা বানানো যেমন সহজ, জীনেদের পক্ষে ইলেক্ট্রো-ম্যাগনেটিক ওয়েভ নিয়ন্ত্রণ করা হয়তো সেরকমই সহজ। সেজন্যই হয়ত জীন-পরী মানুষের মন নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।’ – সে বুঝিয়ে বললো।
‘আমি তো ছোটবেলায় শিখেছি, জীন আগুনের তৈরী।’ – আমি বলেছিলাম।
‘তখনকার মানুষ তো অত বিজ্ঞান বুঝতোনা, সেজন্য এভাবে বলতো। আগুন বলে হয়তো শক্তির ধারণাকেই কেই বোঝানো হয়েছে। আর মহাবিজ্ঞানী আইনস্টাইন তো দেখিয়েই দিয়েছেন যে ম্যাটার আর এনার্জি একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।’
এই ভুতুড়ে বিষয় নিয়ে তার এই অতি আগ্রহের কারণ আমি বুঝতে পারলাম না, কিন্তু ওর মুখে কথাগুলো অনেক মধুর শোনালো বলে পাল্টা জানতে চাইলাম – ‘মন তাহলে কি দিয়ে তৈরি?’
‘মন বলে কিছু নেই, মন শরীরেরই একটা এক্সটেনশন।’ – সে উত্তর দিল।
‘যদি বলি মানুষের মন শব্দ আর বাক্য দিয়ে তৈরি?’ – একজন আদর্শ লেখকের মতো করেই বললাম আমি। কিন্তু সে হেসে উঠল আমার কথা শুনে। অনেকক্ষণ জটিল আলোচনার পর ওর হাসির শব্দ শুনতে পেয়ে আমার মনটা আবার ভালো হয়ে গেল।
আরেকদিন সকালে, দুপুর হওয়ার ঠিক আগে আগে, দুষ্টুমি করে ওকে বললাম – ‘মাঝে মাঝেই তোমাকে আমার খুব দেখতে ইচ্ছে করে। সেই যে প্রথমদিন দেখলাম তারপর তো শুধু কথাই বলেছি।’
‘খুব দেখতে ইচ্ছে করছে?’
‘হ্যা।’
‘তাহলে দেখো।’
ওর বলার ভঙ্গিতে কেন যেন চমকে উঠলাম আমি।
কিন্তু সে বলল যে সে খুব কাছেই কোথাও আছে, আমার বাসায় এখনই আসছে। আমি আকাশ থেকে পড়লাম, ব্যস্ত হয়ে পড়লাম আমার নীল রঙের নতুন শার্টটা খুঁজে বের করতে। এই তাড়াহুড়ার মধ্যে একবারও আমার মনে হল না – ও কি করে আমার বাসায় আসবে, ওকে তো আমার ঠিকানা দেয়া হয় নি। অথচ পাঁচ মিনিটের মাথায় ঠিকই দরজায় একটা কড়া নাড়ার শব্দ শুনতে পেলাম।
দরজা খুলে দেখি ঠিক ঠিকই ইরা দাঁড়িয়ে আছে আমার সামনে – সশরীরে। সোনালী জরি দেয়া পুরোনো আমলের একটা গাঢ় মেরুন সালোয়ার ওর পরনে, হাতে আর গলায় সোনার গয়না, হঠাৎ দেখলে মনে হবে বিয়েবাড়ি থেকে পালিয়ে চলে এসেছে কোন একরোখা কনে। আমার রুমমেটরা কেউ বাসায় ছিল না বলে ওকে ভেতরে এসে বসতে বললাম।
সেদিন ওর দিকে কতক্ষন হা করে তাকিয়ে ছিলাম সেটা মনে নেই। একসময় বললাম – ‘তোমাকে দেখে মনে হচ্ছে পরী নেমে এসেছে আকাশ থেকে।’
ওর চোখে হাসি খেলা করে গেল, বলল – ‘যদি বলি আমি সত্যিই পরী, জীন বাবা আর জিন্নী মায়ের ঘরে আমার জন্ম?’
আমি হেসে উঠি, নির্বিকারভাবে বলি – ‘কিন্তু আমি তো শুনেছি জীন-পরীদের পা উল্টাদিকে হয়। তোমার পা তো ঠিকই আছে।’
‘তোমরা যে মনে করো জীনের পা উল্টা থাকে এটা একধরণের কুসংস্কার, এই তথ্যটার আসলে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।’ – সে দ্রুত উত্তর দেয়, আর তখন আমরা দুজনেই হেসে উঠি। মেয়েটা পারেও – আমি ভাবি। এরপর থেকে আমি মাঝে মাঝে তাকে ইরা না বলে পরী বলেই ডাকতাম।
৫.
লাবনীর সাথে যে যোগাযোগ একদম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল, তা কিন্তু না। মাঝে মধ্যেই ওর সাথে দেখা করতে যেতাম – পার্কে, নাট্যপাড়ায়, অথবা এয়ার কন্ডিশন মার্কেটে। আর ওর সাথে আমার সম্পর্কটাও ছিল এরকমই – কখনো কখনো প্রতিদিন দেখা করা, কখনো বা আবার দীর্ঘ নীরবতায় ডুব দিয়ে থাকা। শুনেছি এটাই প্রাপ্তমনস্ক সম্পর্কের লক্ষণ।
অন্যদিকে ইরা প্রায়ই আমার ঘরে চলে আসতো। ও বলতো, গল্প করার এটাই ভালো জায়গা, বিশেষ করে যখন ঘরে কেউ থাকে না সেসময়। কেমন করে যেন ও চলে আসতোও ঠিক সেই সময়গুলোতে যখন বাসায় কেউ নেই। এক রাতে এগারোটার সময় সে চলে এলো, অথচ এই সময়ে ওর আসার কথা না যেহেতু আমার রুমমেটরা সবাই তখন ঘরে থাকে। কিন্তু সেই বিশেষ রাতে ওরা সবাই গিয়েছিল টিএসসিতে, সারারাত ক্রিকেট দেখবে বলে। আমি জানি না ইরা কিভাবে জানলো আজ বাসা খালি থাকবে।
অন্যান্য দিনের মতোই আমরা সেদিন ঈর্ষা, প্রেম, ইত্যাদি অপ্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে কথা বললাম অনেকক্ষণ। কথা বলতে বলতে হঠাৎ আমার মাথায় কি চাপলো কে জানে, আমি তাকে স্পর্শ করতে চাইলাম। সে অবশ্য বাধা দিল না। ধীরে ধীরে আমার হাত দুটো অবাধ্য হয়ে উঠলো, তাতেও সে বাধা দিলো না। একসময় আমার ঠোঁটও কিছুটা বিদ্রোহী হল, তখনো সে কিছু বললো না।
তারপর হঠাৎ একসময় সম্বিৎ ফিরে পেয়ে ওকে বললাম যে আমি দুঃখিত, আমার শরীর আজ আমার কথা শুনতে রাজি হচ্ছে না। সে হেসে বলল, সে কিছুই মনে করে নি, কিন্তু সাথে সাথে এটাও বলল যে আমি যেটা চাচ্ছি সেটা সম্ভব না।
‘কেন সম্ভব না?’ – আমি জানতে চাইলাম।
‘কারণ আমি মানুষ না।’
‘ও আচ্ছা। তুমি পরী।’ – বলে হেসে উঠলাম আমি, কিন্তু সে হাসলো না, একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। তখন আমি কিছুটা অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করলাম।
কিছুক্ষন ওভাবে তাকিয়ে থেকে হঠাৎ করেই সে আবার হেসে ফেলল। বলল – ‘মিস্টার, আপনার সামনে কোনো মেয়েই আসলে বসে নেই। পুরোটাই আপনার মনের মধ্যে ঘটছে।’
‘তুমি বলতে চাচ্ছো আমি তোমাকে ভুল দেখছি? তোমাকে যে স্পর্শ করলাম সেটাও ভুল?’
‘বুঝিয়ে বল, আমাকে কেন স্পর্শ করতে পারবে না? তুমি যখন স্বপ্ন দেখো, তখন কি তোমার মনে হয় না যে তুমি সত্যি সত্যিই স্বপ্নের ভেতরের জিনিসগুলোকে স্পর্শ করছো?’
‘কিন্তু আমি তো এখন জেগেই আছি, স্বপ্ন দেখছি না।’ – আমি হেসে বললাম।
সেও হাসলো, মিষ্টি সেই হাসি – ‘তুমি ব্যাপারটা এখনো ধরতে পারো নি, আমি তোমার কাছাকাছি একটা জায়গা থেকে তোমার মনে এক নারীর প্রতিচ্ছবি তৈরী করছি, যে নারী কথাও বলছে তোমার সাথে। আমি যদি তোমার দৃষ্টিকে ধোঁকা দিতে পারি, কানকে ধোঁকা দিতে পারি, তাহলে তোমার স্পর্শের অনুভূতিকে কেন ধোঁকা দিতে পারবোনা – শত হলেও পুরোটাই তো তোমার মাথার ভেতরেই ঘটছে, তাই না?’
আমি শিউরে উঠলাম। এমন না যে ওর কথা বিশ্বাস করেছি – আমি রহস্যগল্প লিখি, এগুলো অবিশ্বাস করি বলেই তো সেগুলো লিখতে পারি। হয়তো সেদিন বাসায় একা ছিলাম বলেই ওভাবে কিছুটা আঁতকে ওঠা। কিন্তু এরপর সেরাতে আমাদের আড্ডা তেমন আর জমলো না। সেও হঠাৎ করেই চলে গেল, যেমন হঠাৎ করে এসেছিল। ও যাওয়ার পর কখন যে আমি ঘুমে তলিয়ে গেছি, সেটা বলতে পারবো না।
৬.
এরমধ্যে একদিন লাবনী আমাকে ছয়বার ফোন দিল। আমি ওর ফোন দেখলাম, কিন্তু ধরতে ইচ্ছে হল না বলে পাশে ওটাকে বেজে চলতে দিলাম। ভেবেছিলাম পরে কলব্যাক করে কিছু একটা বানিয়ে বলব, কিন্ত সেদিন সন্ধ্যার পর ওর ফোনের কথা একদমই ভুলে গেলাম।
পরদিন সকাল সাড়ে দশটায় লাবনী আবার ফোন করল। প্রথমে ভাবলাম, ধরবো না। আসলে কি নিয়ে কথা বলব, সেটা বুঝতে না পেরে কিছুটা আতংকিত ছিলাম আমি। আমার আজকাল ঐসব সাহিত্য আর দর্শন নিয়ে কথা বলতে আর ভালো লাগে না। লাবনী অনেক ভালো মেয়ে, কে বলতে পারে হয়তো আমার মত লোক তার সাথে আলাপচারিতার যোগ্যই না। তৃতীয়বারের বার অবশ্য ওর কল রিসিভ করলাম আমি, জানতে চাইলাম সে কেমন আছে। সে অনুরোধ করল যেন ওর সাথে ‘আজই’ দেখা করি – ওর বাসায় গিয়ে – ‘জরুরি’ কি একটা কথা আছে।
হয়তো পড়ালেখার কিছু, হয়তো আলবেয়ার কামুকে নিয়ে নতুন কোন তত্ত্ব কিংবা বিশ্লেষণ। এছাড়া ওর কাছে আর কি জরুরি হতে পারে সেটা আমার মাথায় এলো না। রাজি হয়ে গেলাম, তবে বললাম ওর জন্য একটা ‘সারপ্রাইজ’ আছে। গলা শুনে মনে হল সে খুশি হয়েছে, যদিও মুখে বলল কোন সারপ্রাইজের ওর কোন প্রয়োজন নেই।
কিন্তু আমার মাথায় সেদিন কি যেন এক পাগলামি চেপে বসেছিল, খুব ভেতর থেকে কেউ আমাকে বলছিল যে এই ঘটনাটা আমার ঘটাতেই হবে। আমার পরিকল্পনাটা আমার নিজের কাছেই অবিশ্বাস্য লাগছিল, কিন্তু আমি সত্যিই ভাবছিলাম যে ইরা আর লাবনীকে মুখোমুখি করিয়ে দেয়ার পর যা হবার তাই হবে। আমার মন বলছিল – হয়তো এ ঘটনা থেকে বের হয়ে আসলেও আসতে পারে স্বর্গীয় কোন সমাধান।
ইরাকে প্রস্তাবটা করার সাথে সাথেই কিন্তু সে রাজি হয়ে গেল। লাবনীর কলাবাগানের বাসার ঠিকানা দিয়ে ওকে বললাম ঠিক তিনটার সময় যেন ও ওই বাসার গেটের সামনে থাকে। ইরা বলল সে অবশ্যই আসবে।
সেদিন আকাশে সূর্যটাকে অন্যদিনের চেয়ে বড় আর উজ্জ্বল মনে হচ্ছিল আমার, নিজের ছায়াটাকেও অন্যদিনের চেয়ে বেশি গাঢ় মনে হচ্ছিল। মনের ভেতর বার বার ঘটনাটার রিহার্সেল দিয়ে তারপর একসময় রিকশায় চেপে বসলাম, তিনটা বাজার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে পৌঁছে গেলাম লাবনীদের বাসার সামনে।
রিক্সা থেকে নেমে দেখি ইরা দাঁড়িয়ে আছে সাদা সেই দোতলা বাসাটার সামনে। সে সেদিন রক্তের মত লাল রঙের একটা শাড়ি পরেছিল, গলায় আর কানে ছিল ভারী গহনা। আমি ততদিনে ইরার সেই সাজ দেখে অভ্যস্ত হয়ে গেছি, কিন্তু মুহূর্তের জন্য আতংকিত হয়ে পড়লাম এই ভেবে যে এখানকার এই গলিটা স্বর্ণ গায়ে নিয়ে চলা-ফেরা করার মতো কখনোই অতটা নিরাপদ না।
লাবনী বাসাতেই ছিল, কলিং বেল টিপতেই সে দরজা খুলে দিল। আমি হাসিমুখে ওকে বললাম – ‘শুভ অপরাহ্ন।’ সে সেদিন কালো কাজ করা সাদা একটা জামা পড়েছিল। ভেজা চুল বেয়ে পানি পড়ে পড়ে সেই জামার কাঁধের কাছটা কিছুটা ভিজে ছিল। ওর একপাশের কাঁধে অন্তর্বাসের সাদা স্ট্র্যাপ চোখে পড়ছিল আমার।
সেও হেসে আমাকে ‘শুভ অপরাহ্ন’ বলল, তারপর আমার হাতের দিকে তাকিয়ে বলল – ‘কোথায় আমার সারপ্রাইজ?’
আমি ইরেন্দিনার হাত ধরে দরজার সামনে এনে দাঁড় করিয়ে দিলাম ওকে, তারপর লাবনীর চোখের দিকে তাকিয়ে বললাম – ‘এই যে তোমার সারপ্রাইজ।’
লাবনী একবার ইরার দিকে তাকিয়ে তারপর আবার আমার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
আমি এই বিস্ময়টার জন্য প্রস্তুত ছিলাম, মুচকি হেসে বললাম – ‘ও আমার বন্ধু, ইরেন্দিনা হক।’
কিন্তু এরপর লাবনী যা করল, তার জন্য আমি একদমই প্রস্তুত ছিলাম না। সে একটানে আমাকে ভেতরে নিয়ে গেল, তারপর মূল দরজাটা বন্ধ করে দিল শব্দ করে। ইরা অবশ্য ততক্ষনে ঘরে ঢুকে পড়েছে আমার পেছন পেছন। আমি যেন চোখের কোন দিয়ে ওকে মিটি মিটি হাসতেও দেখলাম।
লাবনী আমাকে ওদের ড্রইংরুমে নিয়ে গেল, বসতে বলল বেতের সোফাতে। ইরাকে সে কিছুই বলল না। আমি অবশ্য শুনেছি যে মেয়েদের মধ্যে এধরণের ঈর্ষা বিরল নয়, তাই অবাক হলাম না। ইরা নিজে নিজেই আমার পাশে এসে বসল, চুপচাপ। লাবনী বসল আমার সামনের সিঙ্গেল সোফাটায়। ওর কপালের রগ ফুলে উঠেছে, দেখতে পাচ্ছিলাম। সে এতটা রেগে যাবে, ভাবিনি অবশ্য।
কিন্তু সে যখন কথা বলল, রাগের বদলে তার কণ্ঠে ফুটে উঠল উৎকণ্ঠা – ‘মামুন, তোমার কি হয়েছে বল তো?’
‘কেন? ঠিকই তো আছি আমি।’ – শান্তভাবে উত্তর দিলাম।
‘যোগাযোগ করো না। ফোন করলে ফোন ধরো না। আজ আবার মূকাভিনয়ের মতো কি সব কথা-বার্তা বলছো।’
‘মূকাভিনয় মানে?’
‘তুমি এমন একটা ভাব করছো যে তুমি একটা মেয়েকে সাথে করে নিয়ে এসেছো, তাকে আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছো। সমস্যা কি বলো তো। আমি তো সেই স্কুল থেকে তোমার ফ্রেন্ড, তাই না? প্লিজ আমাকে বলো তোমার কি হয়েছে। প্লিজ।’
আমি নিজের বিস্ময় লুকানোর কোন চেষ্টাই করলাম না, বললাম – ‘ভাব করব কেন? এইতো ও আমার পাশেই বসা।’ ভাবলাম, লাবনী কি – মনস্তাত্বিক ভাষায় বলতে গেলে – ‘ডিনায়াল’-এর মধ্যে আছে? ও কি মানতে পারছে না যে আমি অন্য কোন মেয়ের হাত ধরে ওর সামনে চলে আসতে পারি?
এসময় লাবনী হঠাৎ কাঁদতে শুরু করল, আর তখনি আমি পাশে তাকিয়ে দেখি সোফায় আমার পাশের জায়গাটা ফাঁকা। ওখানে কেউ বসা নেই। হয়তো বসা ছিলও না কখনো।
হঠাৎ করে মনে হল – লাবনীর না, হয়তো আমারই সাইকোসিস ধরণের কিছু একটা হয়েছে, ফলে আমি ভুল জিনিস দেখছি। লাবনী কিছু বুঝে ওঠার আগেই আমি উঠে দাঁড়ালাম, ও কিছু বলার আগেই ছুটে বেরিয়ে এলাম ওই বাসা থেকে, তারপর রাস্তায় নেমে হাটতে শুরু করলাম যেদিকে দু’চোখ যায় তার উল্টোদিকে।
ইরার পুরোটা বিষয়ই ছিল স্বপ্ন? আশ্চর্য ! স্বপ্ন এতটা সত্য হয় কি করে? সে বিকেলে আমার মনে হচ্ছিল পুরো ঢাকা শহর মরে গেছে, আমিই একমাত্র জীবিত লোক। যাদের দেখতে পাচ্ছি, ওরা সবাই আমার কল্পনা, চোখ বন্ধ করলেই ওরা সবাই নাই হয়ে যাবে।
আমি ভাবছিলাম আর হাটছিলাম। আর তখনি হঠাৎ বৃষ্টি শুরু হল, ঝুম বৃষ্টি। আমি পুরো শহরের সব বৃষ্টি একই নিজের কাঁধে নিয়ে হাটতে লাগলাম। মনে হল, বৃষ্টির পানির সাথে মিশে আমি আজ এ শহরের রাজপথের কোন ড্রেনের ভেতর উধাও হয়ে যাব – কেউ কোনদিন জানবে না, এ কংক্রিটের বস্তির এক কোনায় মামুন নামের এক অপ্রকৃতস্থ ব্যক্তি কোন কোন সন্ধ্যায় হেটে বেড়াতো।
৭.
সেরাতে বাসায় ফিরলাম একদম কাক ভেজা হয়ে। ঘরে ঢুকে দেখি সোফায় ইরা বসে আছে। যে লাল জামাটা পড়ে সে লাবনীর বাসায় গিয়েছিল সেটা পরেই সে বসার ঘরটাতে অপেক্ষা করছে। আমি ভেতরে ঢুকতেই সে হাসলো, কিন্তু আমি ওকে কিছু না বলে বাথরুমে ঢুকে গেলাম। মাথায় পানি ঢালতে ঢালতে খোদাকে ধন্যবাদ দিলাম এজন্য যে আমার সাইকোসিস অন্তত আমার পিছু পিছু বাথরুম পর্যন্ত চলে আসে নি।
সে রাতে আমার অনেক জ্বর এলো। সকালে যদিও জ্বরটা ছেড়ে গেল, কিন্তু শরীরটা দুর্বল লাগতে থাকল। প্যারাসিটামল আর চা খেয়ে বিকেলে একটু ভালো লাগলো বলে চলে গেলাম হলে রাকিবের ওখানে। সময় নিয়ে ওকে খুলে বললাম পুরো ঘটনা। বন্ধুদের মধ্যে আধ্যাত্মিক বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান ছিল ওর। সে আমার কাহিনী মন দিয়ে শুনলো, তারপর বলল, শান্তা নামের সেই মেয়েটার বিদেহী আত্মাই আমার ঘাড়ে চেপে বসেছে। যেদিন শান্তাদের বাসায় প্ল্যানচেট করতে গিয়েছিলাম, সেদিনই ওই ড্রইং রুমে আমার একাকিত্বের সুযোগ সে নিয়েছে, আর এভাবেই আমার জীবনটা সেই অশরীরী নষ্ট করে দিয়েছে।
কলাবাগান জামে মসজিদের খতিব মাহবুব সাহেব, যিনি আবার মদিনায় ছয় বছর লেখা-পড়া শিখে এসেছেন, তিনি অবশ্য রাকিবের সাথে ভিন্নমত পোষণ করলেন। তিনি বললেন তার ধারণা আমাকে বিভ্রান্ত করছে কারিন নামের বিশেষ এক ধরণের শয়তান। প্রত্যেক মানুষের কাঁধে থাকে এই শয়তান, কিন্তু মানুষটা মারা গেলে পর সে বেকার হয়ে পড়ে, আর তখন খুঁজতে শুরু করে নতুন শিকার। আমি সম্ভবত শান্তার শরীর থেকে অবমুক্ত হওয়া নারী-কারিনের পাল্লায় পড়েছি।
‘যারা ফরজ গোসল করে না, বাথরুম করে পানি নেয় না, সেইসব নাপাক লোক হয় এইসব শয়তান জিনের আসল শিকার।’ – তিনি মত প্রকাশ করলেন।
খতিব সাহেবের ব্যাখ্যাটা আমার মনে ধরলো। হতেও পারে, প্ল্যানচেট জাতীয় আসরগুলোতে এই কারিনেরই আবির্ভাব হয়। ওরা তো মৃতব্যক্তির বিগত জীবনের সব গোপন কথা, গোপন প্রেম, মেরে দেওয়া টাকা, গীবত, জুলুম সবই জানে – এগুলি একে-ওকে জানিয়ে দিয়ে মানুষকে ধোঁকা দেয় তারা।
সেদিনের পর থেকে আমি লাবনীকে এড়িয়ে চলা শুরু করলাম। ইরার ফোনও ধরা বন্ধ করে দিলাম। যদিও সে আমার বাসায় আসতো না, ওকে আমি মাঝে-মধ্যেই দেখতে পেতাম চৌরাস্তার মোড়ে, মার্কেটের ভীরে, কিংবা দূরের কোন বাসার ছাদে হেটে বেড়াতে। আমি না দেখার ভাণ করতাম, যদিও আমার মন পড়ে থাকতো ওরই সব স্মৃতিতে।
ওকে ভুলে যাওয়ার সচেতন প্রচেষ্টা হিসেবে ওকে নিয়ে রহস্যগল্প লিখি, যেখানে ওকে নায়িকা বানাই, তারপর আবার গল্পের শেষে ওকে মেরে ফেলি। কিন্তু পরের দিন সকালে উঠে দেখি, নিজের অজান্তেই সেই গল্পের খাতা ছিঁড়ে ফেলেছি, আর এলোমেলো অক্ষরগুলোর আড়ালে সে দিব্যি টিকে আছে আমার সারা অস্তিত্ব জুড়ে।
একবার বনানী ব্রিজের কাছে চলে গেলাম আত্মহত্যা করব ভেবে, কিন্তু শেষপর্যন্ত সাহসে কুলালো না। শুনেছি পানিতে ডুবে মরা খুব কষ্টের। সে সন্ধ্যায় অনেকক্ষণ ধরে রাস্তায় রাস্তায় উদ্দেশ্যহীন ঘোরাঘুরি করে তারপর বাসায় চলে এলাম। মনে মনে হার মানলাম ইরার কাছে, প্রায় দুই মাস পর ওকে ফোন দিলাম। আমার আসলে কিছু করার ছিল না, কারণ আমার মনে হচ্ছিল ইরাকে ছাড়া আমি আর একদিনও বাঁচতে পারবো না।
ইরা সাথে সাথে ফোন ধরল। আমি বললাম, আমি ওকে বিয়ে করতে চাই। সে বলল সে রাজি আছে – কিন্তু যেহেতু এটা খুব অস্বাভাবিক একটা জুটি, সেহেতু আমাকে দুইটা বিশেষ শর্ত পালন করতে হবে।
প্রথম শর্ত, তাকে বিয়ে করার পর অন্য সব মেয়েদের কথা ভুলে যেতে হবে। যদি আমি নিজেকে ‘পরনারী’ থেকে নিরাপদ রাখতে পারি, তাহলে সে আমাকে ভালোবাসবে, আমার সাথে থাকবে চিরদিন, আর আমিও রাজার হালে বাকি জীবনটা কাটাতে পারবো আমার প্রিয় এই শহরে। কিন্তু যদি বিশ্বাসঘাতকতা করি, তাহলে আমাকে সে উড়িয়ে নিয়ে যাবে জীনেদের রাজ্যে, সেখান থেকে কোনোদিন আমাকে ফিরে আসতে দেয়া হবে না।
ওর দ্বিতীয় শর্ত ছিল, বিয়ে হবে জীনদেশের রীতিতে। পরের সোমবার রাতে ঘরে আমার একা থাকতে হবে, সারাঘরে লাল পর্দা লাগাতে হবে, আর বিছানায় থাকতে হবে রক্তলাল চাদর, আর মেরুন রঙের দুটো বালিশ। সূর্য ওঠা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত উপোস থাকতে হবে, তাহলেই সে রাতে হবে অভিনব এক বিয়ের অনুষ্ঠান, রাত শেষে মিলবে আমার পুরষ্কার। দুটো শর্তেই আমি রাজি হলাম। জানিয়ে দিলাম, এখন আমার আর কিছুতেই কিছু যায় আসে না।
সেই শনিবার সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বিছানার পাশে একটা সাদা খাম রাখা। খুলে দেখি ওর ভেতর পনর হাজার টাকা। বুঝতে পারলাম টাকা-পয়সা নিয়ে আমাকে সারাজীবনে আর একবারও চিন্তা করতে হবে না। আগেও শুনেছি, পরী বিয়ে করলে টাকার অভাব হয় না – অন্যায়ভাবে যারা বড়োলোক হয় তাদের বাড়ি থেকে পরীরা টাকা চুরি করে এনে আমার মতো গরিবদেরকে দিয়ে দেয় – অনেকটা রবিনহুডের মত করে। এই টাকা বোধ হয় আরেকটা জিনিস প্রমান করে, আর সেটা হল ইরার ব্যাপারটা শুধুই আমার মনের চিন্তা না।
সোমবারদিন সারাদিন না খেয়ে থেকে সন্ধ্যার দিকে আমি নেতিয়ে পড়লাম। ওর কথামতো সারা ঘরে লাল পর্দা লাগিয়েছি, বিছানায় লাল চাদর দিয়েছি, ঘরে জ্বালিয়েছি একশো একটা মোমবাতি, আর নিজেকে বন্দি করেছি ঘরের ভেতর। বিকেলের দিকে প্রচন্ড মাথাব্যথা নিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়েছি, তারপর একসময় ঘুমিয়ে গেছি। ঘুমিয়ে মাকে স্বপ্নে দেখলাম, যেন আমাকে কাছে এসে বসতে বলছে, আর স্বপ্নের ভেতরই আমি কেঁদে বুক ভাসাচ্ছি।
রাত বারোটায় একটা শব্দে আমার ঘুম ভেঙে গেল। দেখি একপাশের কাঠের জানলা কি করে যেন একটু খুলে গেছে আর বাতাসে বারবার বাড়ি খাচ্ছে ওটা ফ্রেমে। সবগুলো মোমবাতি নিভে গেছে, কিন্তু ঘরে মনে হচ্ছে অনেকগুলো মানুষ দাঁড়ানো। আমি উঠে দাঁড়াতেই হঠাৎ ভীষণ কোলাহল শুরু হল – মনে হল, আমি স্টেডিয়ামে বসা আর হাজার হাজার লোক একসাথে চিৎকার করছে। যখন মনে হল আমার কানের পর্দা ফেটে যাবে, তখনি আবার কোলাহল থেমে গেল, আর তারপরই শুরু হল ভীষণ জোরে ধাক্কা।
এবার মনে হল আমি একটা মিছিলের ঠিক মাঝখানে পড়ে গেছি, আর পুলিশ অতর্কিতে ধাওয়া দিয়েছে জনতাকে, ফলে হাজার হাজার লোক একসাথে এক গলির ভেতর ঢোকার চেষ্টা করছে, কিন্তু পারছেনা, আর তখন ভিড়ের চাপে পিষ্ট হয়ে আমি মারা যাচ্ছি। যখন মনে হল আমার দমটা বেরই হয়ে যাবে, তখন আবার হঠাৎ সব চাপ উধাও হয়ে গেল। আমি দেখলাম একটা একটা করে মোমবাতিগুলো সব জ্বলে উঠছে।
একসময় একশো একটা মোমবাতির সবগুলোই জীবন্ত হয়ে উঠলো, আর আমি দেখলাম ওগুলোর ঠিক মাঝখানে ইরা বসে আছে। ওর গায়ে ওড়নার মত একটা কাপড়, কিন্তু ওটা এত স্বচ্ছ যে তার ভেতর দিয়ে আমি ওর ফর্সা ত্বক পুরোপুরি দেখতে পাচ্ছি। আমি হামাগুড়ি দিয়ে ওর কাছে গিয়ে ওকে জড়িয়ে ধরতেই সব আলো আবার নিভে গেল, আর আমার মনে হলে নরম লোমশ কোন বড় পুতুলকে ধরে আমি শুয়ে আছি। এরপর আমার আর কিছু মনে নেই।
৮.
ইরার সাথে প্রথম কয়েকটা মাস আমার খুব ভালো কাটলো। ও আমার খুব যত্ন নিতো। বিয়ের এক সপ্তাহের মধ্যেই আমি মিরপুরের নিরিবিলি একটা এলাকায় ছোট-খাট একটা বাসা ভাড়া নিয়েছিলাম। টাকা দিয়েছিল ওই, যদিও কোথা থেকে তা এনেছে তার কিছুই আমি জানি না। আমি অবশ্য জানতেও চাই নি, আগের চেয়ে ভালো আছি এটাতেই আমি আপাতত খুশি ছিলাম।
সে খুব ভালো গৃহিনী ছিল। যা খেতে চাইতাম, তাই সে রান্না করে দিতো। প্রতিদিন সকালে ঘিয়ে ভাজা পরোটা সাথে পেঁয়াজ-মরিচ দিয়ে ডিম ভাজি, দুপুরে ইলিশ পোলাও কিংবা হাজির বিরিয়ানী, রাতে নানরুটি দিয়ে নেহেরি। সাথে প্রতি বেলায় থাকতো শরবত, এই শরবত যেকোন কোমল পানীয় থেকে ভালো আর ওটা খাবার সাথে সাথে অতিরিক্ত খাবার সমস্ত কষ্ট দূর হয়ে যায়। আর রাতে তো থাকতোই অন্য রকম সব বিনোদন।
এভাবে আমার দিনকাল ভালোই কেটে যাচ্ছিল। আমার ওজন কেজি দশেক বেড়েও গিয়েছিল। কিন্তু বিয়ের মাস ছয়েক পার হতেই আমি একটা জিনিস লক্ষ্য করলাম – যেখানেই যাই, আমার মনে হয় দুটো চোখ আমাকে অনুসরণ করছে। আমার কেন এরকম মনে হতো, বলতে পারবো না। ইরা তো সারাক্ষণ বাসাতেই থাকতো।
আমি মাঝে-মধ্যে বাজারে যেতাম, সপ্তাহে একদিন বা দুদিন রশিদ মামার বাসায়। মামাকে অবশ্য বলিনি আমি জীন বিয়ে করেছি, সে হয়তো আমাকে আর তাহলে ঘরেই ঢুকতে দিতো না। কিন্তু যেখানেই যেতাম, বাসায় ফেরা মাত্র শুরু হতো ইরার পুলিশি জেরা – কোথায় গিয়েছিলাম, কি খেয়েছি, কতক্ষণ ছিলাম সেখানে আর কতক্ষণ রাস্তায়, কার কার সাথে কথা হয়েছে আর কি কি কথা, এসব। এত বিশদ বর্ণনা মনে রাখতে পারতামনা বলে মাঝে মাঝে এটা-ওটা বানিয়ে বলতাম, আর তখনি লাগতো গন্ডগোল। কেমন করে সে যেন ঠিক ঠিকই ওই বানিয়ে বলা অংশটা ধরে ফেলত আর খুব রাগ করতো।
ও যেদিন আমার ওপর রেগে যেত, সেদিন আমার সাথে আর কথা বলতো না। রাতে ঘুমানোর জন্য সে অন্য ঘরে চলে যেত, কিন্তু আমার মনে হতো আমার বিছানার ওপর একটা কালো ছায়া সারা রাত ধরে সিলিঙের সাথে ঝুলে আছে আর আমার দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছে। সেসব রাতে সারা রাত দুঃস্বপ্ন দেখতাম আমি – চাপাতি হাতে কেউ আমাকে ধাওয়া করছে, কিংবা চাপদাড়ি একজন লোককে জবাই করা হচ্ছে আর সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে সেটা দেখছে টাকার বিনিময়ে, আমার চেয়ে লম্বা একটা বড়ো কুকুর আমার সাথী হয়ে এখানে-ওখানে যাচ্ছে, এধরণের স্বপ্ন।
শেষরাতের দিকে আমার পা ভারী হয়ে আসতো, মনে হতো কেউ আমার পায়ের গোড়ালি চেপে ধরেছে তারপর চাপটা ধীরে ধীরে উপরে বুকের দিকে আসছে। দম বন্ধ হয়ে যাওয়ার আতঙ্কে যখন আমার বুক ধড়ফড় করতে শুরু করতো, তখন চাপটা চলে যেত কিন্তু ততক্ষনে আমার সারা শরীর ঘামে ভিজে গেছে।
মোটকথা ওর রাগ আমার জন্য খুব একটা সুখকর কিছু ছিল না, ফলে যেদিন বাইরে যেতে হতো, বাসায় ফিরতাম ভয়ে ভয়ে। সেই দিনগুলোতে আমি চেষ্টা করতাম পারতপক্ষে বাইরে না যেতে, বেশিরভাগ সময় ওর চোখের সামনে থাকতে।
অবশ্য ঘরে থাকলেই যে ওর প্রশ্নবাণ থেকে সবসময় বেঁচে থাকতে পারতাম, সেটাও না। নাস্তার পর চা খেয়ে মন ভালো লাগছে বলে হয়তো গুন গুন করে গান গাইছি, সে জানতে চাইলো এর সাথে গতকালের বাইরে যাওয়ার কোন সম্পর্ক আছে কিনা। অথবা হয়তো বিকেলে মেঘলা আকাশ দেখে ক্যাসেটে একটা বিরহের গান বাজালাম, সে জিজ্ঞেস করল কোন মেয়ের বিরহের কারণে আমার এই গান শোনা।
সব মিলিয়ে একসময় আমার নাভিশ্বাস উঠে গেল, এক সন্ধ্যায় ধৈর্য হারিয়ে বলে ফেললাম – আমি এই বন্দি জীবন থেকে মুক্তি চাই। সে কিছু না বলে উঠে চলে গেল। সে রাতে আমি আবার দুঃস্বপ্ন দেখলাম, দেখলাম চাপদাড়িওয়ালা একজন লোককে কাঁচাবাজারের মধ্যে জবাই করা হচ্ছে আর সবাই গোল হয়ে দাঁড়িয়ে সে দৃশ্য দেখছে টাকার বিনিময়ে। শেষরাতে আবার আমার সারা শরীর কেউ চেপে ধরল, পা থেকে শুরু করে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল সেই চাপ।
সকালে যখন ঘুম থেকে উঠলাম, তখন মনে হল আমি বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে পারছি না। ওর কাছে মাফ চাইলাম গতকালের ‘দুর্ব্যবহারের’ জন্য, তখন ওর মুখে দেখলাম হাসি ফিরে এসেছে। সন্ধ্যা হবার ঠিক আগে দিয়ে সেদিন বাসা ছেড়ে পালালাম ছোট একটা ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে, যদিও ইশার আজান হবার আগেই ঝোড়ো বাতাসের মতো কিছু একটা ধাক্কাতে ধাক্কাতে আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে এলো বাসায়।
সে রাতে আমার মনে হচ্ছিল যেন আমার হারানোর আর কিছুই নেই – একটা গাছ আরেকটা গাছের ছায়ায় বেড়ে উঠতে পারে না, আর সম্পর্কের মধ্যে থাকতে হয় কিছুটা ব্যবধান যেন স্বস্তির বাতাস বয়ে যেতে পারে দুটি মনের মাঝখান দিয়ে। ওকে বললাম, আমি তো কোন শর্ত ভঙ্গ করিনি, কোন পরনারীর সাথে প্রেম করিনি, তাহলে কেন আমাকে একজন যুদ্ধবন্দীর মতো জীবন-যাপন করতে হচ্ছে।
উত্তরে সে যা বলল তাতে আমি আকাশ থেকে পড়লাম। সে বলল সে আগুনের তৈরী, আর আমি মাটির তৈরী, সে অর্থে সে আমার চেয়ে শ্রেষ্ঠতর জাতি থেকে এসেছে, সুতরাং ওকে বিয়ে করতে পেরে আমার নিজেকে ধন্য মনে করা উচিত, আর আমার বর্তমান জীবন নিয়ে আমার গর্বিত হওয়া উচিত।
আমি পাগলের মতো হেসে উঠলাম, বললাম – ‘তুমি তো দেখছি ভীষণ বর্ণবাদী, রেসিস্ট। তোমরা কি দিয়ে তৈরী সেটা দিয়ে শ্রেষ্ঠত্ব ঠিক করছো?’
‘যেটা সত্য সেটাই তো আমি বললাম, এখানে ভুল কোথায়?’ – সে শীতল কণ্ঠে উত্তর দিল।
‘বস্তু কিন্তু স্থিতিশীল, শক্তির তুলনায়। এই দেখো – মানুষের আছে ভাষা, লিপিবদ্ধ করার ক্ষমতা, যার কারণে আমরা প্রযুক্তিতে উৎকর্ষ আনতে পেরেছি। তোমাদের জীন জাতির কি তেমন কিছু আছে? আছে মিল-কারখানা? বিশ্ববিদ্যালয়? পাঠাগার? সাহিত্য? অর্থনৈতিক ব্যবস্থা? গণিত বা বিজ্ঞান?’
‘শ্রেষ্ঠ জীবের এসব দরকার হয় না।’ – সে বলে – ‘যারা নিচু জাত তাদেরই ওপরে ওঠার জন্য এগুলা দরকার হয়।’
হয়তো আমার মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছিল, আমি আবার হেসে উঠে বললাম – ‘আমার তো ধারণা তোমাদের নিজস্ব ভাষাও নেই। তুমি বাংলায় কথা বলছ, কারণ আমার মনের ভেতর থেকে শব্দ আর বাক্যও তোমাকে ধার করতে হচ্ছে। আমি যে দুটা ভাষা জানি, তোমার আলোচনা সে দুটাতেই সীমাবদ্ধ । আমি কি ভুল বললাম?’
তার চোখ দেখি ভীষণ লাল হয়ে উঠেছে, সে বোধ হয় যে কোনো মুহূর্তে বিস্ফোরিত হবে। আবার না আমাকে গলা টিপে ধরে! সে গমগমে গলায় বললো – ‘উন্নত জীবের ভাষা দরকার হয় না।’
আমি হো হো করে হাসতেই থাকলাম, তখন সে আমার সামনে থেকে চলে গেল।
রাত বারোটার দিকে মানসিকভাবে প্রস্তুত হলাম সারারাত দুঃস্বপ্ন দেখা আর শেষরাতে দম বন্ধ হয়ে আসার শাস্তির জন্য। কিন্তু রাত একটার দিকে ইরা আমার সামনে দেখা দিয়ে বলল সে আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সে বলল সে এখান থেকে চলে যাবে, কিন্তু বিয়ে ভাঙবে না, বিয়ের শর্তও আগের মতোই থাকবে – অর্থাৎ আমার বাকি জীবন অন্য কোন মেয়ের দিকে তাকাতে পারবো না। আমি রাজি হলাম। পরদিন সকালে উঠে দেখি সত্যি সত্যিই সে চলে গেছে।
কিন্তু আমার ভোগান্তি পুরোপুরি শেষ হল না। প্রায় রাতেই দেখতাম দুঃস্বপ্ন। মাঝে মাঝে শেষরাতে পায়ের হাঁড়ের ওপর সেই প্রচন্ড চাপ হতো, যাতে মনে হতো আমার পা দুটো দুমড়ে-মুচড়ে কেউ ভেঙে ফেলছে। সপ্তাহ ঘুরতে না ঘুরতেই বুঝে ফেললাম, মুখে ছেড়ে যাবে বললেও ইরা আসলে আমাকে পুরোপুরি ছেড়ে যেতে পারে নি। ভাবলাম, হয়তো মনে মনে কিছুটা ভালোবেসেও ফেলেছে আমাকে সে, যদিও জানি না ওদের প্রজাতির ভালোবাসা মানুষের প্রেমের মতোই হয় কিনা, ওদের সেই প্রেমে মানব-মানবীর ভালোবাসার মতোই ঈর্ষা আর ঘৃণা মেশানো থাকে কিনা।
যা হোক, এসব চলছিল বলে কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমি শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলাম। রাতে ঘুমাতে পারতাম না বলে সারাদিন মাথা ব্যথা থাকতো। দীর্ঘদিন এভাবে ভোগার পর এক দুপুরে চলে গেলাম রশিদ মামার টিএন্ডটির অফিসে। উনিই এই শহরে আমার একমাত্র আত্মীয়, তাই উনাকে খুলে বললাম ইরার সমস্ত আদ্যোপান্ত, আর করজোড় করে সাহায্য চাইলাম। রশিদ মামা সব কথা মন দিয়ে শুনলেন, আশ্বাস দিলেন তিনি সঠিক ব্যবস্থা নেবেন তখন সব ঠিক হয়ে যাবে।
৯.
রশিদ মামা কাজ করতেন একাউন্টস সেকশনে, কিন্তু নফলসহ মোট ছয় ওয়াক্ত নামাজ প্রতিদিন নিয়ম করে পড়তেন, ঢাকার গুণী আধ্যাত্মিক চক্রগুলোতে ছিল তার অবাধ যাতায়াত। তিনি একদিন আমাকে ধরে-বেঁধে পুরান ঢাকার জীর্ণ এক গলির ভেতর মাওলানা ওয়াসিউদ্দিনের ‘বৈঠক ঘরে’ নিয়ে গেলেন। ওয়াসিউদ্দিন সাহেবের বাবা মাওলানা নাজিমুদ্দিন ছাহেব নাকি জীন বশ করতে পারতেন, দীর্ঘ কর্মবহুল জীবনে তিনি শত শত জীন আয়ত্বে এনেছিলেন। উত্তরাধিকার সূত্রে সেসব জীন এখন তার সুযোগ্য পুত্র ওয়াসিউদ্দিনের নেতৃত্ব বিনা বাক্যে মেনে নিয়েছে। এই জীনের পাল ব্যবহার করে দারিদ্র্য আর মৃত্যু ছাড়া পৃথিবীর যেকোন সমস্যা সমাধান করা সম্ভব বলে দাবী করেন তিনি।
দীর্ঘ অপেক্ষার পর ওয়াসিউদ্দিন সাহেব আমাকে সময় দিতে পারলেন। সব কথা শুনে কিছু দোয়া আর তাবিজ লিখে দিলেন, এগুলো ঘরে টাঙিয়ে রাখতে বললেন। জোয়ার-ভাটার পানিতে ফু দিয়ে বললেন সেগুলো ঘরে ছিটাতে। মামা আমার ওপর ভরসা করলেন না, নিজেই আমার ঘরে ঢোকার দরজার ওপর দোয়া টাঙিয়ে দিলেন, খাটের মাথায় পিন গেড়ে তাবিজ ঝুলিয়ে দিলেন।
সে রাতে ইরা আবার এলো আমার ঘরে, নিজের চেহারা দেখাল, তারপর পরিষ্কার জানিয়ে দিল যে – সে এসব ভয় পায় না, কারণ সে বিজ্ঞানমনস্ক, তাবিজ-কবজে তার বিশ্বাস নেই, তাই এসবে তার ঘাবড়াবারও কোন কারণ নেই।
‘আমাদের পূর্বপুরুষরা লেখা-পড়া জানত না, নানা রকম কুসংস্কারে আক্রান্ত ছিল। তখন দোয়া, মন্ত্র, যেকোনো কিছু পড়লেই তারা ভাবতো তাদের কোনো ক্ষতি হবে, ভয়ে পালিয়ে যেত। সেই দিন এখন আর নেই। ভুলে যেও না, এটা উন্মুক্ত তথ্যের জমানা।’ – বলে সে সেদিনের মত বিদায় নিলো।
আমার নিজেরও ঝড়-ফুঁক জাতীয় চিকিৎসায় খুব একটা ভরসা নেই, তাই নিজে এপয়েন্টমেন্ট করে চলে গেলাম ঢাকা শহরের নামকরা এক সাইকায়াট্রিস্টের কাছে। সব শুনে তিনি আমাকে কিছু ঘুমের ওষুধ দিলেন। আমি তাকে হাত জোর করে বললাম ঘুম বেশি হলে ইরা স্বপ্নে আরো বেশি করে আমার কাছে আসার সুযোগ পাবে ফলে আমার অসুস্থতা আরো বাড়বে। তাকে অনুরোধ করলাম যেন আমাকে বরং উনি জেগে থাকার কোন ওষুধ দেন। ডাক্তার ভদ্রলোক আমার দিকে অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন, যেন এমন কথা জীবনে প্রথম তিনি শুনেছেন।
একসময় বুঝতে পারলাম, আমার সমস্যা আমাকেই সমাধান করতে হবে। এক রাতে যখন সে পায়ের ওপর চেপে বসে আমার পুরো পা অবশ করে দিচ্ছিল আর আমি ব্যথায় গোঙাছিলাম, তখন আমার সব ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেল। বিছানাতেই উঠে বসে চিৎকার করে বললাম – ‘সাহস থাকলে সামনে আসো, তোমার সাথে আমি কথা বলতে চাই।’
কিন্তু কেউ সামনে এলো না, যদিও মনে হল ঘরের ভেতর অন্ধকারের একটা অংশ এদিক থেকে ওদিক সরে গেল।
চিৎকার করে বললাম – ‘তুমি সামনে আসলেই কি আর না আসলেই কি। আমি খুব ভালো করেই জানি, তোমার আসলে নিজের কোন চেহারাও নেই। এজন্য শান্তা নামের সেই মেয়েটার চেহারা ধার করে আমার সাথে দেখা করেছো এতদিন।’
কোন উত্তর এলো না বলে আবার চিৎকার করলাম – ‘তোমার আসলে কোন নামও নেই। আমি বিদেশী একটা বই পড়ছিলাম, যার নায়িকা ইরেন্দিনা, তোমার নামটাও তুমি সেখান থেকে ধার করেছো।’
এবারো কোন উত্তর নেই। আমি তখন শেষে বললাম – ‘আসল কথা হলো, তুমি আমার মনের ওপর বেড়ে ওঠা এক পরজীবী ছাড়া আর কিছুই না।’
সেই মুহূর্তে আমি কাচের কিছু একটা ভাঙার শব্দ শুনতে পেলাম, ধারণা করলাম গ্লাস। তারপর আরেকটা কিছু, এভাবে একটার পর একটা। প্রায় আধা ঘন্টা ধরে চলল এই তান্ডব। ভোরবেলা ফজরের আজানের ঠিক আগে দিয়ে থামলো আমার ঘরের সেই তুফান। সাহস করে উঠে লাইট জ্বালিয়ে দেখি, সারা ঘরে ভাঙা কাচের টুকরা। কাচের তৈরি এমন কিছু বাকি নেই যা ভাঙা হয়নি। বুঝতে পারলাম না, এত কিছু থাকতে কাচের ওপর কেন ওর সব রাগ।
ইরেন্দিনা নামধারী সেই পরীর সাথে সেই আমার শেষ দেখা। কেউ বিশ্বাস করুক বা না করুক, আমি এখন তার জাদু থেকে পুরোপুরি মুক্ত – সম্পূর্ণ নিজস্ব পদ্ধতি প্রয়োগ করে আমি ওর কাছ থেকে এই মুক্তি ছিনিয়ে নিয়েছি। চাইলে এখন আমিও জিনের আসর থেকে মুক্তি দেয়ার জন্য চিকিৎসাকেন্দ্র খুলতে পারি, এমনকি হয়তো ওয়াসিউদ্দিন সাহেবের ব্যবসার সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও গড়ে তুলতে পারি। আর কে না জানে, ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতা দেশের অর্থনীতির জন্য সবসময়ই ভালো।
সেই অশরীরী নারীর কবল থেকে মুক্ত হওয়ার পর একদিন লাবনীদের কলাবাগানের বাসায় গেলাম ওর সাথে দেখা করতে। আমার আশা ছিল, সবকিছু খুলে বললে সে আমাকে ক্ষমা করবে, তখন আমরা আবার কয়েকটা দিন একসাথে কাটাতে পারবো। কিন্তু ওই ঠিকানায় গিয়ে দেখি সেখানে এখন অন্য মানুষ ভাড়া থাকে।
লাবনীর সাথে আমার আর কোনদিন দেখা হয় নি। সেও আর কোনদিনই আমার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করেনি – হয়তো ইচ্ছে করেই। একবার শুনলাম সে প্রবাসী কোন প্রতিষ্ঠিত বাঙালিকে বিয়ে করে বিদেশে চলে গেছে, যদিও আমি নিশ্চিত না। আমি ধরে নিয়েছি এটাই আমার প্রাপ্য ছিল, যেহেতু আমি শরীর অতিক্রম করে ওর মন পর্যন্ত কখনই তেমনভাবে পৌঁছাতে পারি নি।
তারপরও কোন কোন বিকেলে যখন বারান্দায় একা বসে থেকে থেকে হঠাৎ লাবনীর কথা মনে পড়ে যায়। ভাবি – হয়তো এতদিন ভুল এক বারান্দাতে অপেক্ষা করেই সময় কাটিয়ে দিয়েছি, নিজের অনভিজ্ঞতার কারণে আসল পরীকে চিনতে ভুল করেছি, আর এক ডাইনীর কবলে পড়ে নিজের জীবনকে শুধুই বিপন্ন করেছি।
আসলে ডাইনীরা হাজার বছর ধরে এভাবেই নি:সংগ ভীরু ছেলেদের বিশ্বাসকে নিয়ে খেলা করে আসছে, শহরগুলির অলিতে-গলিতে ওরা ছড়িয়ে রাখে জাল, স্ট্রীটলাইটের আলোর আড়ালে চলে ষড়যন্ত্র আর কালোযাদুর খেলা। তাবিজ দিয়ে বশ করে রাখে তারা মানুষের বুদ্ধিকে, বুদ্ধি তখন চলে আবেগের নির্দেশে। আমি যদি এসব থেকে বাঁচতে চাই, তাহলে মাথার বাইরে এসে আমাকে চিন্তা করতে হবে – পারলে আমার আবেগকে শ্বাসরোধ করে হত্যাও করতে হবে, তাহলেই হয়তো একদিন পাবো সঠিক মানুষটির দেখা। ঐ নতুন সংগিনীর সামনে গিয়ে যখন দাঁড়াবো, আমার হৃদয়ে হয়তো আর কোন আবেগ অবশিষ্ট নেই – তবু তো জন্য যে ডাইনীদের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারছি। আমি এখন বুঝে ফেলেছি, ডাইনীরা যুক্তিকে সত্যিই দারুন ভয় পায়।
