সিদ্ধেশ্বরী লেনের নিৎসে
১ .
সিদ্ধেশ্বরী লেনের মনোয়ারা ক্লিনিকে গম্ভীর মুখে জন্ম নিলো এক শিশু। বাচ্চারা জন্মানোর পর কেঁদে ওঠে, কিন্তু সে কাঁদলো না। রাজীব সাহেবের ভ্রু জোড়া অনেকটা সময় ধরে ভীষণভাবে কুঁচকে রইলো। ডিউটি ডাক্তার তখন দৌড়ে এলো, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে জানালো – শিশু সম্পূর্ণ সুস্থ আছে, বাচ্চারা জন্মানোর পর কেঁদে ওঠে ঠিকই, কিন্তু না কাঁদা অস্বাভাবিক কিছু না। রাজীব নিশ্চিন্ত হলেন, স্ত্রী হালিমা খাতুনের সাথে পরামর্শ করে ছেলের নাম রাখলেন জহির।
জহির ছোটবেলা থেকেই ছিল দুর্বল স্বাস্থ্যের, প্রতি বছরই শীত আসার আগে দিয়ে হুপিং কফে আক্রান্ত হত – তার কাশি দেখে মনে হত ওর ছোট্ট ফুসফুসটা একটু পরই ওর কাশির সাথে বের হয়ে আসবে। এমনিতে সে কথা বলত কম, শুনত বেশি। সমবয়সী খালাতো ভাই তুহিন আর তুষার এসে যখন তাকে খোঁচাতো, সে পাল্টা তেড়ে যেতো না। রহিম চাচা পেছনে বাঁকা হেসে বলতো, ‘রাজীবের ছেলেটা মনে হয় প্রতিবন্ধী’। কিন্তু জহির যখন মাঝে মাঝে জটিল সব প্রশ্ন জিজ্ঞেস করত তার বাবাকে, তখন বোঝা যেত যে তাকে যতটুক মনে হয় তার চেয়ে অনেক বেশি সে বোঝে।
জ্যামিতি শেখার এক পর্যায়ে সে তার বাবাকে জিজ্ঞেস করেছিল – অতীত আর ভবিষ্যৎ কি বর্তমানের মতই বাস্তব সত্য, নাকি সেগুলো অবাস্তব সত্য। রাজীব ছেলেকে সেসব জিনিস নিয়েই চিন্তা করতে বললেন যেগুলো তার পাঠ্যবইয়ের সাথে প্রাসঙ্গিক।
ক্লাস সিক্সে পড়ার সময় ওর নানী আনোয়ারা বেগম মারা গেলেন, প্রায় ছয় মাস লিভার সিরোসিসে ভোগার পর। জানাজার পর জহির তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, মারা যাওয়ার পর মানুষ কোথায় যায়। রাজীব সাহেব উত্তরে বলেছিলেন, মারা যাওয়ার পর পরকাল শুরু হয়ে যায়।
‘কিন্তু কবরে তো লাশ পচে যায়, ওখান থেকে তো তার এদিক-ওদিক কোথাও যাওয়ার সুযোগ নেই।’ – জহির মন্তব্য করেছিল।
‘মানুষের শরীর পচে যায়, কিন্তু ভেতরের আত্মাটা খোদার কাছে ফিরে যায়।’
বাবার এ উত্তরে জহির অবশ্য ভরসা করতে পারছিল না। তাই সে এ বিষয়ে বিভিন্ন বই-পত্র ঘাটাঘাটি করা শুরু করল। সেন্ট জোসেফ স্কুলে লাইব্রেরিটা ছিল বড়, বই ছিল অসংখ্য বিষয়ে। সে বিজ্ঞান বিষয়ক বই দিয়েই শুরু করল, কিন্তু কোথাও খুঁজে পেল না যে আত্মা নামে কোনকিছু কেউ কোনোদিন প্রমান করতে পেরেছে। দর্শনের কিছু বইয়ে আত্মার কথা আছে, কিন্তু একেক বইয়ে একেক ধারণা লেখা, সুতরাং ওগুলোর ওপর সে ভরসা করতে পারলো না। মুখে কিছু না বললেও জহির ধরে নিলো, আত্মার ধারণা মানুষের উর্বর মস্তিষ্কেরই আবিষ্কার, আত্মা বলে আসলে কিছু নেই, তার মানে মৃত্যু হওয়ার সাথে সাথে সব কিছুর শেষ।
ওর ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর ওর মা হালিমা খাতুন যখন মারা গেলেন, তখনো সে কাঁদল না। কাঁদবে কেন? গাছের পাতা যেভাবে ঝরে যায়, মানুষেরও তো সেভাবেই অনিবার্য ঝরে যাওয়া।
মা মারা যাওয়ার কয়েকমাসের মধ্যে ছিল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এডমিশন। জহির ঢাকা ভার্সিটিতে ভর্তি পরীক্ষায় দ্বিতীয় হল। এতে আশ্চর্যের কিছু ছিলোনা, কারণ সে মেট্রিক-ইন্টারমিডিয়েট দুটাতেই গোল্ডেন জিপিএ পেয়েছিল। কিন্তু সবাই যেটাতে অবাক হল সেটা হলো এত বিষয় থাকতে সে পড়ার জন্য বেছে নিয়েছে দর্শনকে। রাজীব সাহেব যখন জানতে চাইলেন সে ভেবে-চিনতে সিদ্ধান্ত নিয়েছে কিনা, সে শুধু বললো যে এ বিষয়ে তার একটা নিজস্ব পরিকল্পনা আছে।
ভার্সিটিতে অবশ্য সে খুবই ভালো রেজাল্ট করল। সে যখন চতুর্থ বর্ষে, তখন ধর্ম বিষয়ে তার একটা পেপার আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত হল। ওর সুপারভাইজার ডক্টর খালেদ বললেন, এটা দর্শন বিভাগের বিরল সাফল্যগুলোর মধ্যে একটা। মাস্টার্স পাশ করার পর সে লেকচারার হিসেবে যোগ দিল একই বিভাগে, এক বছরের মধ্যে বিলাতে গেল উচ্চতর পড়াশুনা করতে।
এডিনবার্গ ইউনিভার্সিটির স্কুল অফ ডিভিনিটিতে সে পিএইচডি শেষ করল মাত্র তিন বছরে। সাধারণত এ ডিগ্রি শেষ করতে পাঁচ বছর সময় লাগে। সে যখন দেশে ফিরে এলো, তখন তার বয়স মাত্র চব্বিশ। তাকে ‘দর্শন বিভাগের সর্বকনিষ্ঠ প্রফেসর’ বলে ডাকতো তার ডিপার্টমেন্টের জ্যেষ্ঠ শিক্ষকেরা।
এ সময়ই তার বিয়ের জন্য ছোট খালা সামিনা বেগম মেয়ে দেখা শুরু করলেন। এদিকে সদ্য ডক্টরেড করা জহির মেয়ে দেখতে গিয়ে মেয়ের মা-খালাদের দিকে খেয়াল করে বোঝার চেষ্টা করত, মেয়ে আসলে কি রকম। মেয়েরা নাকি দেখাদেখির সময় এতো সেজে থাকে যে তাদের সত্যিকার চেহারা বা স্বভাব বোঝা সম্ভব হয় না। এক কনের মায়ের পান চিবানো দেখে সেই মেয়েকে সে বাতিল করেছিল। আরেক কনের খালাকে ভীষণ মোটা দেখে সে সেই ভদ্রমহিলার মধ্যে ঐ হবু বধূর ভবিষ্যতকেই দেখতে পাচ্ছিল – ফলে যথারীতি ওটাও বাদ।
এভাবে মেয়ের পর মেয়ে বাতিল হতে থাকল, ওদিকে বাড়তে থাকল তার বয়স। একসময় তার ছোট খালা এই পাত্রী দেখার দায়িত্ব থেকে অবসর নিলেন। জহিরেরও আর এ জীবনে বিয়ে করা হয়ে উঠলো না।
২.
ডক্টর জহিরের বয়স যখন একচল্লিশ, তখন তার মাথায় এক নতুন ধারণা আস্তানা বানিয়ে বসলো। তিনি সম্পূর্ণ নিজের উদ্যোগে এক আন্দোলন শুরু করলেন, এর নাম তিনি দিলেন ‘ঢাকা শহরের প্রথম দার্শনিক আন্দোলন’। সেগুনবাগিচার এক রেস্তোরায় সংবাদ সম্মেলনেরও আয়োজন করলেন তিনি নিজ খরচে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে তার একটা পরিচিতি ছিল, ফলে কয়েকটা সংবাদপত্র তার সেই উদ্যোগে সাড়া দিয়ে প্রতিনিধিও পাঠাল।
সেটা ছিল এক মঙ্গলবার। চাংপাই চাইনিজ রেস্তোরার রিসার্ভ করা রুমে মাত্র তিনজন সংবাদ প্রতিনিধি আর এসিস্টেন্ট প্রফেসর ইমরানকে নিয়ে সম্মেলন শুরু করলেন ডক্টর জহির। ইমরান মাত্র তিন মাস হয় জহিরের একই বিভাগে জয়েন করেছে সদ্য পাশ করা শিক্ষক হিসেবে।
সংবাদ সম্মেলনের প্রথমেই ডক্টর জহির বলে নিলেন যে তার এই ঘোষণা যুগান্তরকারী, তিনি এর নাম দিতে চান ‘ঢাকা ঘোষণা’। তার কথা শুরু হতেই একজন সাংবাদিক হাই তুললো, কিন্তু তিনি তার বক্তব্য চালিয়ে গেলেন। প্রথমেই তিনি ফ্রেডেরিক নিৎসেকে উদ্ধৃত করে বললেন, ইয়োরোপে ঈশ্বরকে মৃত ঘোষণা করা হয়েছে সেই ১৮৮৮ সালে, কিন্তু এ বিষয়ে ভারতীয় উপমহাদেশ এখনো পিছিয়ে আছে।
তিনি দাবি করলেন, সেকুলার সমাজব্যবস্থার কারণেই পাশ্চাত্য বিশ্ব আজ উন্নতির শিখরে, আর ধর্মীয় আবেগ আঁকড়ে ধরে রাখার কারণেই আমরা আজও এত পিছিয়ে। আন্তর্জাতিক মহলে প্রশংসিত তার নিজস্ব গবেষণার উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি বললেন, বাংলাদেশে ধর্মীয় হানাহানির মূল কারণ রাষ্ট্রীয়ভাবে বৈজ্ঞানিক সত্যকে প্রাচীন সব ধর্মের বাণীর ওপর স্থান না দেয়া। এ বিষয়ে সবগুলো মূল ধর্মকে সমানভাবে দায়ী করলেন, আর শেষে বললেন যে এই ‘ঢাকা ঘোষণা’র মাধ্যমে বাংলাদেশেও তিনি ঈশ্বরকে মৃত ঘোষণা করতে চান।
তার বক্তব্যের এই পর্যায়ে ‘কালান্তর’-এর সাংবাদিক মবিন পকেট থেকে ফোন বের করে ‘হ্যালো’, ‘হ্যালো’ বলতে বলতে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। বাকি দুজন সাংবাদিক পরস্পর মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগলো, যদিও তারা তাদের জায়গাতেই বসে রইল। ডক্টর জহিরের সহকর্মী ইমরান যেটা করল সেটার জন্য অবশ্য কেউই প্রস্তুত ছিল না, সে উঠে দাঁড়ালো তারপর দৌড়ে ঘর থেকে বের হয়ে গেল। বোঝাই যাচ্ছিল, সংবাদ সম্মেলনের বিষয় নিয়ে তার কোন পূর্ব ধারণা ছিল না।
পরদিন ডক্টর জহির একটু আগে আগে ঘুম থেকে উঠলেন। রাতে উত্তেজনাবশত তার ঘুম প্রায় হয়ই নি বলতে গেলে। সূর্য ওঠার পর পরই চলে গেলেন মোড়ের দোকানে তারপর কিনলেন সেই তিনটি দৈনিক পত্রিকা যেগুলো থেকে তার সম্মেলনে লোক এসেছিল। উত্তেজনার কারণে এমনকি গেট দিয়ে বিল্ডিঙে ঢোকার সময় ছোটোখাটো একটা হোঁচটও খেলেন জহির।
ড্রইং রুমে বসে সামনে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ রেখে পত্রিকা গুলো উল্টে-পাল্টে দেখা শুরু করলেন জহির। প্রথম দেখলেন ‘কালান্তর’ – প্রথম পাতা থেকে শুরু করে শেষ পাতা, তারপর অতিরিক্ত সংখ্যা পর্যন্ত। কিন্তু না, কোথাও তার সংবাদ সম্মেলনের খবর নেই। তারপর দেখলেন ‘মানব বাংলা’, সেখানেও কোথাও খবরটা পাওয়া গেল না। ‘যুগের কণ্ঠ’-তেও একই অবস্থা।
এত সহজে ছেড়ে দেয়ার পাত্র অবশ্য ডক্টর জহির নন। তিনি ওই তিনজন সাংবাদিককে ফোন করার চেষ্টা করলেন। সকাল এগারোটা থেকে প্রায় বিশবার ফোন করার পরও কেউ ফোন ধরলো না। পাঁচটার পর ‘কালান্তর’-এর সাংবাদিক মবিন কল ব্যাক করল, বলল – তার বোর্ড এই সংবাদ না ছাপানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে, এখানে তার কোন হাত নেই। দরকার হলে জহির পত্রিকার সম্পাদকের সাথে এ বিষয়ে কথা বলতে পারেন। ফোন রাখার আগে মবিন গলা নিচু করে বলল – ‘স্যার, বোঝেনই তো অবস্থা, এসব ছাপালে পত্রিকা অফিসে হামলা-টামলা হতে পারে। আমরা এসব রিস্ক নিতে পারি না।’
জহির সাহেব ফোন রেখে দিলেন। সেদিন সন্ধ্যা নাগাদ তার শরীরের বিভিন্ন জায়গায় লাল চাকা চাকা দাগ দেখা যেতে লাগলো, হঠাৎ করেই। জহির ধরে নিলেন, এটা অতিরিক্ত মানসিক ধকলেরই ফল। আসলে সাংবাদিকদের ডাকার আগে তিনি বুঝতে পারেন নি এই ঘোষণার সাফল্যের ওপর মানসিকভাবে তিনি কতটা নির্ভর করে ছিলেন। একটা দলকে পুরো টুর্নামেন্ট জুড়ে সমর্থন করার পর সেই দল যখন ফাইনালে হেরে যায় তখন যেমন খারাপ লাগে, তার সেরকম খারাপ লাগতে শুরু করল।
পরদিন বৃহস্পতিবার তার সারা শরীরে ব্যথাও শুরু হলো, জ্বর হলে যেমন ব্যথা হয় সেরকম। ডক্টর জহিরের পরিকল্পনা ছিল বিষয়টা নিয়ে মতিঝিলের পত্রিকা পাড়ায় গিয়ে সরাসরি সম্পাদকদের সাথে কথা বলার, কিন্তু যখন তার মনে হলো তার সারা শরীরে পিঁপড়া কামড়াচ্ছে, তখন তিনি সত্যিই হাল ছেড়ে দিলেন। সিদ্ধান্ত নিলেন, এ ব্যাপারে আপাতত আর কোন পদক্ষেপ নেবেন না, কটা দিন যেতে দেবেন।
বিপদাপদ অবশ্য তার পিছু ছাড়লো না। কেমন করে যেন তার এই সংবাদ সম্মেলনের বিষয়টা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ফাঁস হয়ে গেল। তার সেই আপাত-অদ্ভুত দাবীর কথা মানুষের মধ্যে ছড়াতে সময় লাগলো না। ঢাকা শহরের অলিতে-গলিতে তার নাম ধরে গালি দেয়া শুরু হল। নারায়ণগঞ্জের এক এমপি তাকে মীর জাফরের সাথে তুলনা দিয়ে স্ট্যাটাস লিখলেন, দাবি করলেন ডক্টর জহির বাংলাদেশের বৃহত্তর ধর্মীয় জনগোষ্ঠীর সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। এমনকি নতুন বাবা-মায়েদের মাঝে সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর নাম হিসেবে ‘জহির’ শব্দের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেল।
এর মধ্যে একদিন তাকে তার এক ছাত্র বললো, তাকে অনেকে আড়ালে-আবডালে ‘সিদ্বেশ্বরী লেনের নিৎসে’ বলে ডাকছে। জহির অবশ্য বুঝতে পারলেন না, এটা ভালোবাসা থেকে দেয়া নাম নাকি ঘৃণার কারণে দেয়া নাম। এদিকে তার মাংসপেশিগুলো জায়গায় জায়গায় অবশ হয়ে যাওয়ার সেই সমস্যাটা তাকে তখনো ভোগাচ্ছে। তার বন্ধু ডাক্তার মুনীরকে ফোন করলেই সে বলে ‘ও কিছু না, সব ঠিক হয়ে যাবে’, কিন্তু মাস তিনেক পার হয়ে যাওয়ার পরও কোনো কিছু ঠিক হলো না।
এদিকে বাস্তবতা হলো, তার ‘সিদ্বেশ্বরী লেনের নিৎসে’ নামের চেয়ে ‘মুরতাদ জহির’ নামটাই বিভিন্ন অনলাইন পোর্টালে বেশি জনপ্রিয় হলো। ইউটিউব চ্যানেলের বিভিন্ন উদ্যোক্তার মধ্যে প্রতিযোগিতা লেগে গেল কে কার আগে ডক্টর জহিরের বক্তব্যকে নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করতে পারে। এমনকি জুন মাসের এক সন্ধ্যায় এলিফেন্ট রোডের জুতার দোকানগুলোর সামনে ডক্টর জহির সন্দেহ করলেন তিনজন যুবক তাকে অনুসরণ করছে।
ছেলেগুলো ছিল জিনসের প্যান্ট আর পাঞ্জাবি পরা, মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি, মাথায় গোল টুপি। হয়তো ওদের কাছে ধারালো অস্ত্র আছে, হয়তো রাম দা। এক পর্যায়ে ডক্টর জহির দৌড়াতে শুরু করলেন, পেছনে দেখলেন ওদেরও গতি বেড়ে গেছে। তখন সামনে একটা খালি বেবিট্যাক্সি দেখে তিনি কোনোমতে সেটাতে উঠে বসে হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন।
ততদিনে ডক্টর জহিরের মুরতাদ হওয়ার খবর গণমাধ্যমে চলে এসেছে। জাতীয় মসজিদের খতিব মাওলানা বোরহানউদ্দিন খান মাদানী পত্রিকার মাধ্যমে তাকে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাওয়ার আহবান জানিয়েছেন। ডক্টর জহিরও জুমার দিন নামাজে উপস্থিত হলেন বায়তুল মোকাররম মসজিদে। খতিব সাহেব নামাজের পর তাকে উপস্থিত মুসল্লিদের উদ্দেশ্যে কথা বলার সুযোগ দিলেন।
বক্তব্যের শুরুতে জহির মুসল্লিদের সালাম দিলেন। তারপর বললেন তার সাম্প্রতিক এক গবেষণার বিষয়ে কিছু ‘ভুল বোঝাবুঝি’ সৃষ্টি হয়েছে। সরাসরি ক্ষমা না চাইলেও তিনি তার বক্তব্যে স্পষ্ট করলেন যে তিনি মূলত বলতে চেয়েছিলেন যে মানুষের মনে ঈশ্বরের প্রতি বিশ্বাস কমে গেছে। আর তিনি শুধু বাস্তব অবস্থাটাই তার গবেষণায় ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন, ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে কষ্ট দেয়ার কোনো ইচ্ছেই তার আসলে ছিল না।
খতিব বোরহানউদ্দিন মাদানী সাহেব বিজ্ঞ আলেম। তিনি ডক্টর জহিরকে সমর্থন করলেন। মুসল্লিদের বললেন – ইসলামের সৌন্দর্য ক্ষমা, আর যে খোদার পথে ফিরে আসে খোদা তাকে সাথে সাথে ক্ষমা করে দেন, এমনকি তার আগের জীবনের গুনাহগুলোও নেকি হয়ে যায়। শেষে বললেন, অনেক মানুষ নাস্তিকতার পথ ধরেই খোদার রাস্তায় আসে, সুতরাং কারো ঈমানের ব্যাপারেই আমাদের হতাশ হওয়া চলবে না।
৩.
জাতীয় মসজিদে উপস্থিত হওয়ার পর থেকে ডক্টর জহিরকে নিয়ে ইউটিউব-জেহাদিদের মধ্যে যে জোশ জেগে উঠেছিল, সেগুলো ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এলো। এমনকি তাকে ‘মুরতাদ জহির’ কিংবা ‘সিদ্ধেশ্বরী লেনের নিৎসে’ বলাও কমে গেলো। বাবা-মায়েরা আবার ‘জহির’ দিয়ে সদ্যভূমিষ্ঠ সন্তানের নাম রাখা শুরু করলেন। কিন্তু ততদিনে তার শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি হয়েছে।
এখন তার সারা শরীরে সবসময় ব্যথা হতে থাকে, চামড়ার ওপর লালচে হয়ে ওঠা বিভিন্ন জায়গাগুলো ফুলে ফুলে উঠছে। জহির বিভিন্ন ডাক্তার দেখালেন, কিন্তু কেউ কোন সমাধান দিতে পারলো না। প্রায় মাস ছয়েক ভোগার পর তিনি দিল্লির এস্কর্ট হাসপাতালে গেলেন চিকিৎসার জন্য। সেখানেই শেষ পর্যন্ত তার রোগটা ধরা পড়ল।
ডক্টর জহিরের আসলে এক বিরল রোগ হয়েছিল, যাতে শরীরের কোষগুলোর অকালমৃত্যুহতে থাকে। ভারতীয় ডাক্তাররা জানালেন, এই রোগের চিকিৎসা বেশ জটিল। তারা কিছু ওষুধ দিলেন, কিছু অনুশীলন শেখালেন, কিন্তু কোন গ্যারান্টি দিতে পারলেন না রোগ আরোগ্যের।
জহির ঢাকায় ফিরে এলেন। বাসায় ফেরার পর জহির বুঝতে পারলেন, তিনি বেঁচে আছেন কিন্তু তার শরীর ধীরে ধীরে মরে যাচ্ছে। জীবনে এই প্রথম তিনি জানলেন, পৃথিবীতে শুধু তারই জন্য একটা সকাল আসবে যেটা হবে তার জীবনের শেষ সকাল, সামনের যে কোন দিন একটা বিকেল আসবে যার পর আর কোনোদিন কোন বিকেল তিনি দেখতে পাবেন না।
জহিরের বন্ধু প্রফেসর মুনির এক বুধবার সন্ধ্যায় তাকে দেখতে এলেন। ছেলেবেলার মতো একসাথে চা আর নোনতা বিস্কিট খাবার পর জহির বললেন – ‘আচ্ছা মুনির, আমার যদি এই অসুখ নাও হতো, তবুও তো একদিন না একদিন আমাকে মরতেই হতো, তাই না? আমাদের অস্তিত্ব যদি অনন্তকালের জন্য স্থায়ী নাই হয়, তাহলে পঞ্চাশ বছর বাঁচা আর আশি বছর বাঁচার মধ্যে আসলে তো কোন তফাৎ নেই।’
জহিরের বন্ধু প্রফেসর মুনির এক বুধবার সন্ধ্যায় তাকে দেখতে এলেন। ছেলেবেলার মতো একসাথে চা আর নোনতা বিস্কিট খাবার পর জহির বললেন – ‘আচ্ছা মুনির, আমার যদি এই অসুখ নাও হতো, তবুও তো একদিন না একদিন আমাকে মরতেই হতো, তাই না? আমাদের অস্তিত্ব যদি অনন্তকালের জন্য স্থায়ী নাই হয়, তাহলে পঞ্চাশ বছর বাঁচা আর আশি বছর বাঁচার মধ্যে আসলে তো কোন তফাৎ নেই।’
মুনির মাথা নাড়লেন। তখন জহির যোগ করলেন – ‘আর অসম্ভব না যে নেকরোসিসে মারা না গেলেও আমি হয়তো সড়ক দুর্ঘটনাতেও মারা যেতে পারতাম, তাই না? আচ্ছা মুনির, ঈশ্বর বলে যদি কেউ থাকেন, তাহলে মসজিদে গিয়ে সবার সামনে মাফ চাওয়ার পর আমার অসুখ বেড়ে গেলো কেন?’
‘বন্ধু, তুমি মনে হয় এতদিন শাস্তিরও উপযুক্ত ছিলে না। মাফ চেয়ে এখন স্বর্গীয় সান্নিধ্যে আস্তে পেরেছো।’ – প্রফেসর মুনির হেসে বললেন। কিন্তু বন্ধু চলে যাবার পর প্রথম প্রহর রাতে বারান্দায় একা একা বসে থেকে তার মনে চলে এলো নানান ভাবনা।
মৃত্যু যদি এতটাই স্বাভাবিক হয়, তাহলে তার জীবনের কি অর্থ? সার্ত্রে বলেছিলেন – জীবনের বিশেষ কোনো অর্থ নেই, মানুষের জীবন পশুর জীবনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ না, আমরা জীবনের যেসব অর্থের কথা চিন্তা করি সেগুলো আমাদের নিজেদেরই আরোপ করা ধারণা। অন্যদিকে ধর্মগুলো বলে – মানুষ সৃষ্টি হয়েছে স্রষ্টাকে খুশি করার উদ্দেশ্যে, যদিও বিশ্বাস ছাড়া এসব ধারণাকে মেনে নেয়ার আর কোন উপায় নেই।
অনেক ভেবে-চিন্তে জহির যুক্তির পক্ষে থাকারই সিদ্ধান্ত নিলেন। সারা জীবন যে দর্শনকে আঁকড়ে ধরে কাটিয়েছেন, মৃত্যুর ভয়ে তাকে ত্যাগ করার কোনো মানেই হয় না। তাই নিঃসঙ্গ জীবনের শেষ কয়টা দিন মেনে নেয়ার আপ্রাণ চেষ্টা চালালেন যে মৃত্যুতেই তার অস্তিত্বের শেষ। কিন্তু সত্য তো এই যে ক্ষনিকের এ জীবনটাও তিনি তেমনভাবে উপভোগ করেন নি, ফলে সবকিছু মিলিয়ে তার আফসোস আরো বাড়লো বই কমলো না – ওই শেষ কয়টা দিন।
৪.
মাত্র তেতাল্লিশ বছর বয়সে জহির নামের সেই বিরল প্রতিভার মৃত্যু হলো। তার শরীরের কোষগুলো এত দ্রুত মরে যাচ্ছিল যে চিকিৎসাগুলো তার সাথে পাল্লা দিয়ে পারছিলো না। তার আশে-পাশের লোকজন ধারণা করছিলো যে তিনি তওবা করেই মারা গেছেন, তার জীবনের প্রথম দিককার ভুল অবস্থান থেকে সরে এসেছেন সময় মতো। অল্প কিছু কট্টর নিন্দুক যদিও বলতো যে ঈশ্বরকে মৃত প্রমান করতে গিয়ে তিনি নিজেকেই মৃত হিসেবে আবিষ্কার করেছেন, আর খোদা তো জীবনেরও আগে মৃত্যুকে সৃষ্টি করেছেন।
মৃত্যুর ঘটনাটা অবশ্য ডক্টর জহির তেমন করে বুঝতে পারলেন না। তার মনে হল, তিনি গভীর এক ঘুমিয়ে তলিয়ে যাচ্ছেন, তারপর হঠাৎ করেই সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল। একসময় তার মনে হলো তিনি একইসাথে শরীরের ভেতরে আর বাইরে। কবরে দাফন করা পর্যন্ত তিনি লোকজনের কথা-বার্তাও অস্পষ্টভাবে শুনতে পেলেন। তার তখন মনে হচ্ছিলো তিনি দীর্ঘ একটা দুঃস্বপ্ন দেখছেন।
তাকে মাটি চাপা দিয়ে সবাই চলে যাওয়ার পরই তিনি প্রথম দেখতে পেলেন সেই জীব দুটোকে। ওদের শরীর বিশাল, মুখ রক্ত বর্ণ, চোখ আগুনের কুন্ডলি, নাক দিয়ে ক্রমাগত ধোঁয়া বের হচ্ছে, সারা শরীরে ক্যাকটাসের কাটা। ছোটবেলায় ঠাকুমার ঝুলির গল্পে পড়া রাক্ষসের কথা মনে পড়ে গেল জহিরের। ওরা যেন তার জন্যই ওঁৎ পেতে বসে ছিল আর এখন সামনে উদয় হয়েছে জ্যান্ত তার চামড়া ছিড়ে মাংস কামড়ানো শুরু করবে বলে।
প্রাণীগুলো তার দিকে কিছুক্ষন তাকিয়ে রইলো, তারপর ওদের মধ্যে ডানদিকের জন কথা বলে উঠল – ওর একেকটা শব্দ যেন একটা করে বজ্রপাত, প্রতিটা ধ্বনি কান ফাটিয়ে দেয়, প্রতিটা চাহনি যেন চোখ ধাঁধিয়ে দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেয়। সে আর্তনাদ করে জহিরকে জানিয়ে দিলো যে অনাগত শাস্তির সংবাদ। বললো – জহিরের জন্য অপেক্ষা করছে এমন এক নিঃসঙ্গতা যাকে শুধু আগুনের সাথেই তুলনা করা চলে, সেও আবার এমন আগুন যা এক হাজার বছর জ্বলার পর লাল বর্ণ ধারণ করেছে তারপর আরো এক হাজার বছর জ্বালার পর হয়ে গেছে অন্ধকারের মতো কালো। এটাই সৃষ্টিজগতের মধ্যে সবচাইতে তীব্র একাকিত্ব, কারণ এটা স্রষ্টাকে হাতের কাছে পেয়েও হারিয়ে ফেলার অনুতাপে পূর্ন।
পচে যাওয়া লাশের মতো কুৎসিত জীবগুলোর সাথে পরিচয়ের এ পর্যায়ে জহির হাসতে শুরু করলেন। প্রথমে মৃদু হাসি হলেও একপর্যায়ে দ্রুতই সে হাসি বাড়তে বাড়তে তার নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলো। হাসতে হাসতে শেষে যখন তার চোখ বেয়ে নেমে এলো কলমের কালির মতো গাঢ় কালো দু’ফোটা অশ্রু, তখনি কেবল তিনি থামলেন। জহির ততক্ষনে নিজের ভাগ্য মেনে নিয়েছেন, মেনে নিয়েছেন যে তার শেষ ঠিকানা নরকই, দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছেন ঈশ্বর আছেন আর পরকালও তারই সৃষ্টি।
বাঁ দিকের ভয়ঙ্কর জীব একসময় জহিরের কাছে জানতে চাইলো এই অদ্ভুত হাসির কারণ। কিন্তু জহির সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে ঈশ্বরকে ধন্যবাদ দিলেন, আর তার সেই উচ্চারণ কবরের এক দেয়াল থেকে আরেক দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরতে লাগলো।
প্রাণী দুটো তখন নিশ্চুপ তার দিকে তাকিয়ে থাকে, হয়তো তাদের স্বর্গীয় জীবনে প্রথমবারের মতো অবাকও হয় এরা। কিন্তু ঈশ্বরের প্রতি জহিরের এই কৃতজ্ঞতা তার হৃদয়ের গভীর থেকেই ছিল, আর সেটা এজন্য যে দয়াময় খোদা মৃত্যুর মাধ্যমে তার অস্তিত্বকে ধ্বংস করে দেন নি। তার কাছে নরকও তাই এক অর্থে স্রষ্টার করুনা বলেই মনে হলো।
মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকতে পারা একজন মানুষের জন্য কতটা স্বস্তির, সেটা যদি এই দেবদূতরা বুঝতো !
