দেহের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হল ফুসফুস। এর কাজই হচ্ছে শ্বাস নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতি থেকে অক্সিজেন বা জীবণীশক্তি গ্রহণ করা এবং শ্বাস ছাড়তে ছাড়তে শরীর থেকে দূষিত কার্বন-ডাই-অক্সাইড বের করে দেয়া। শরীরের অক্সিজেন গ্রহণ অর্থাৎ ‘প্রাণ’ এর পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হলে, সমস্ত শরীরই ধীরে ধীরে ক্ষতির দিকে এগিয়ে যাতে থাকবে। তাই শরীরকে ঠিক মতো শ্বাসগ্রহণ ও শ্বাসত্যাগে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে হবে।
এক্ষেত্রে ব্রিদিং এক্সারসাইজ অন্যতম এক সহজ সমাধান হতে পারে।
একটু খেয়াল করলে দেখতে পাবেন যে, শ্বাসগ্রহণ করলে বাচ্চাদের পেট ফুলে ওঠে এবং শ্বাস ছাড়লে পেট চুপসে যায়। ব্রিদিং এক্সারসাইজ ঠিক এভাবেই হয়। ক্রমশ বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে আমাদের ব্রিদিং প্যাটার্ন চেঞ্জ হতে থাকে, আমরা তখন পুরাটাই চেস্ট ব্রিদিং বা বুক দিয়ে শ্বাস নিতে শুরু করি।
এর জন্য বুক ভরে শ্বাস নেওয়ার চর্চা করতে হবে। এতে পেট ও পাকস্থলির ব্যায়াম হয়। গভীরভাবে শ্বাস চর্চা করলে ফুসফুস ভালোভাবে কাজ করে। পেট ও পাকস্থলিতে রক্তচলাচল স্বাভাবিক হয়। খাবার হজমজনিত সমস্যাও দ্রুত কমে আসে। যা থেকে পেতে পারেন সহজ স্বতঃস্ফূর্ত জীবন।
নিয়মিত ব্রিদিং এক্সারসাইজের অভ্যাস থাকলে শরীর অনেকটাই টক্সিন মুক্ত থাকে৷ বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, শরীরের প্রায় ৭০ শতাংশ টক্সিনই ব্রেদিং এক্সারসাইজের সময় বেরিয়ে যায়৷ আর টক্সিন মুক্ত শরীর মানেই সুস্থতা।
নিয়মিত ব্রেদিং এক্সারসাইজ করলে শরীরে রক্ত সঞ্চালন সঠিকভাবে হয়৷ ফলে শরীরকে ব্যথা বেদনা তেমন কাবু করতে পারে না৷ শরীর অনেক নমনীয়ও থাকে৷ এছাড়া হৃত্পিণ্ড, লিভার, প্যানক্রিয়াসের মতো শরীরের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলিও ব্রিদিং এক্সারসাইজের ফলে, আরও ভালোভাবে কাজ করতে পারে৷ শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে৷
ব্যস্ত জীবনযাপনের অন্যতম বড় সমস্যা হল স্ট্রেস৷ স্ট্রেসের মোকাবিলা করার সর্বোত্তম উপায় হলো ব্রিদিং এক্সারসাইজ৷ ডিপ ব্রিথিং’য়ের মাধ্যমে বুক ও ফুসফুসের অসাধারণ ব্যায়াম হয়।
তাছাড়া কাজের চাপে যারা আলাদা করে শরীরচর্চা করার সময় পান না, তাদের জন্যও ব্রিদিং এক্সারসাইজ পারফেক্ট অপশন৷ নিয়মিত অভ্যাসে আপনি হয়ে উঠবেন ফিট এবং অ্যাক্টিভ৷ যারা নিয়মিত শরীর চর্চা করেন, তারাও প্রতিদিন কিছুটা সময় ব্রিদিং এক্সারসাইজের জন্য বরাদ্দ রাখতে পারেন৷
কিভাবে করতে হবেঃ
ব্রিদিং এক্সারসাইজ আপনি দিনের যেকোনও সময়ে, বা যেকোনও জায়গায় করতে পারেন৷
. এটি করতে আপনার পছন্দের আরামদায়ক কোনো জায়গায় বসুন। হাত দুটো রাখুন হাঁটুতে। ঘাড় থাকবে সোজা। এবার নাক দিয়ে গভীরভাবে শ্বাস নিন। ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে শ্বাস ছাড়ুন। অথবা বিছানায় চিত হয়ে শুয়েও এ ব্যায়াম করতে পারেন।
. প্রথমে ধীরে ধীরে গভীরভাবে শ্বাস নিন।
. শ্বাস নেওয়ার সময় ১ থেকে ৫ পর্যন্ত গুণতে থাকুন।
. এবার ধীরে ধীরে মুখ দিয়ে শ্বাস ছাড়ুন। শ্বাস ছাড়ার সময় ১ থেকে ৭ পর্যন্ত গণনা করুন।
. এভাবে ১০/১৫ বার করতে হবে।
. ঘুমের সমস্যা হলে বিছানায় শুয়েও একই নিয়মে এতই করতে পারেন। এতে শরীর ‘রিলাক্স’ হয়ে ঘুম আসতে সহজ হবে।
প্রথম প্রথম এই ব্যায়াম টি করতে আপনার সমস্যা হতে পারে। তবে হাল ছাড়বেন না, চর্চা চলিয়ে যান।
এই ব্রিদিং এক্সারসাইজ এর চর্চা করতে হয়, যখন আপনি পুরাপুরি শান্ত ও সুস্থ অবস্থায় থাকবেন, নতুবা হঠাৎ করে করতে সমস্যা হবে। আর একবার আপনি এটাতে অভ্যস্ত হয়ে গেলে, যেকোনো স্ট্রেস অবস্থায়, প্যানিক এটাক, অনিদ্রায় অনায়াসে এই ব্য্যায়ামের মাধ্যমে ম্যাজিকের মতো আরাম পেতে পারেন।
স্ট্রেস বা দুশ্চিন্তা করলে মানুষের মাংসপেশী শক্ত হয়ে যায়। এই ব্যয়ামের সাহায্যে মাংসপেশী শিথিল করা হয়। এজন্য এই ব্যয়ামকে শিথিলায়ন ব্যয়ামও বলা যায়। অনেকে এই ধরণের ব্যায়ামকে ‘আরামের ব্যায়াম’ ও বলে থাকেন। দেখা গেছে যে, মাংসপেশী ঠিকমতো শিথিল করতে পারলে স্ট্রেসের লক্ষণ কমে যায়।
এই ব্যায়ামের কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। এছাড়া এর অনেক ধরনের উপকার আছে বিধায় অনেকে এই ধরণের ব্যয়ামকে ‘বিহেভিয়রাল এসপিরিন’ বা আচরণমূলক এসপিরিন বলে অভিহিত করে থাকেন। কেননা, এসপিরিন ঔষধের মতোই এই ব্যায়ামের অনেক ধরনের উপকার আছে। যেমন,
. ব্রিদিং এক্সারসাইজ হরমনের কার্যকারিতা স্বাভাবিক রাখে।
. মানসিক চাপ কমায় ও টেনশন দূর করে।
. শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রতঙ্গকে সুস্থ ও স্বাভাবিক রাখে।
. মেজাজ ভালো রাখে।
. রক্ত দূষণমুক্ত করে ও রক্তচলাচল স্বাভাবিক রাখে।
. ফুসফুস সুস্থ রাখে।
. দেহের বাড়তি ওজন কমায়।
. ব্যথানাশক হিসেবে কাজ করে।
অক্সিজেন প্রাণশক্তির উৎস। তাই বুক ভরে শ্বাস নিলে, প্রাণশক্তিতে দেহ প্রাণবন্ত হয়ে উঠবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। নিয়মিত এই ব্যায়ামের চর্চা করলে মানসিক ও শারিরীক আমূল পরিবর্তন অনুভব করতে পারবেন।
এই লেখার উদ্দেশ্য চিকিত্সা নয়, শুধুমাত্র সচেতনতা বৃদ্ধি করা। কোন ভাবেই এটিকে প্রেসক্রিপসন বা রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যাবেনা।
যেকোনো রোগ বা সমস্যার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
……তিনা শুভ্র ।।
