………………………………
আমরা অনেকেই ভাবি, নিয়মিত শ্যাম্পু না করলে, মাথায় খুশকি থাকলে, কিংবা মাথা পরিষ্কার না রাখলে উকুন জন্মায়। কিন্তু এই ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। কারো মাথায় উকুন হওয়ার একমাত্র কারণ হচ্ছে, যার মাথায় আগে থেকে উকুন আছে, এমন ব্যক্তির সংস্পর্শে আসা বা তার সাথে ঘুমানো।
উকুন কেন হয় এবং উকুন তাড়ানোর নিয়ে সঠিক ধারনা যদি আমাদের না থাকে, তাহলে যেকোন সময় আপনার মাথায় উকুন, বারবার ফিরে আসতে পারে।
আসলে মাথার চুলে উকুনের এই সমস্যা গোটা দুনিয়াতেই দেখা যায়। বিশেষ করে মহিলা ও স্কুলপড়ুয়া বাচ্চাদের মধ্যেই এই সমস্যা বেশি হয়ে থাকে। উকুন হল ছোট আকারের পরজীবী, যা মানুষের রক্ত খেয়েই বেঁচে থাকে। মাথার ত্বক এবং চুলে উকুন বাস করে এবং এতে মাথা সারাক্ষণ চুলকাতে থাকে। শুধু তা-ই নয়, সমস্যা বাড়লে কখনও কখনও চোখের পাতা ও ভুরুতেও উকুন হতে পারে।
ইউটিউব কিংবা বিভিন্ন ব্লগে উকুন মারার ঔষধ এর নাম খুঁজলে, অনেকে বিভিন্ন ভেষজ উপায়ে উকুন মারার কৌশল পেয়ে যাবেন। রসুন, আমলকি, ট্রি-টি, অলিভ অয়েল, নিমপাতা, নারকেল তেল, পেয়াজ, ভিনেগার ইত্যাদি হাজারো উপাদানের নাম পাওয়া যায়। কিন্তু এই ধরনের ভেষজ উপাদান দিয়ে যে উকুন পুরোপুরি ধ্বংস হয়, এর সঠিক কোন প্রমাণ পাওয়া যায় নাই। হয়তো এদের বেশিরভাগ ঔষধেই কিছু উকুন মরে কিন্তু উকুনের ডিম সম্পূর্ন ধ্বংস হয় না। ফলে কিছুদিন পর আবার ডিম থেকে নতুন উকুন জন্ম হয়।
বর্তমানে, উকুন মারার জন্য এক ধরনের ওষুধ বহুল পরিমাণে ব্যাবহার হচ্ছে, যা টানা দুই/তিন দিন ব্যবহারে, আপনার মাথা থেকে উকুন সম্পূর্নভাবে শেষ করবে এমনকি উকুনের ডিমও শেষ করে দিবে। যেমন, Licnil, Alice (Ivermectin BP 5 mg ) ইত্যাদি। যেকোনো ধরনের ফার্মেসি দোকানে এ ওষুধটি কিনতে পাওয়া যাবে।
এই ওষুধ একটি নিরাপদ ধরনের ওষুধ। ডাক্তারের তত্ত্বাবধান ছাড়াই এই ওষুধ ব্যবহার করা যায়। তবে যারা গর্ভবতী বা বাচ্চাকে দুগ্ধ পান করান, তাদের এই ওষুধ ব্যবহারের আগে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ছয় মাস বা তার বেশি বয়সীরা এই উকুননাশক ওষুধটি অনায়াসে ব্যাবহার করতে পারবেন। তারপরও ব্যাবহারের পূর্বে ডাক্তারের পরামর্শ নিতে পারেন।
ব্যাবহার বিধিঃ
সঠিকভাবে ওষুধটি ব্যবহার করতে না পারলে, আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যাবে না। তাই ব্যবহারের পূর্বে অবশ্যই নিয়মটি ভালোভাবে পড়ে নিন।
সামান্য ওষুধ হাতের আঙ্গুলে নিয়ে, চুলের গোড়ায় ভালভাবে লাগিয়ে দিন। এরপর আস্তে আস্তে চুলের অন্যান্য অংশে লাগান। এমন ভাবে লাগাতে হবে, যেন চুলের আগা থেকে গোড়া সম্পূর্ণ অংশে ওষুধটি লাগে। এতে চুলের গোড়ায় এবং চুলে অন্যান্য অংশে থাকা উকুন ও উকুনের ডিম সম্পূর্ণভাবে মারা যাবে। ভালোভাবে লাগানো হলে দশ মিনিট অপেক্ষা করুন। ১০ মিনিট পর চুল ভালোভাবে ধুয়ে ফেলুন। মনে রাখতে হবে চুল ধোয়ার সময় মাথায় কোন ভাবেই শ্যাম্পু বা সাবান দেয়া যাবেনা। ঠিক একই ভাবে পরেরদিনও মাথায় আবার ওষুধটি ব্যবহার করুন। আপনি চাইলে এর পরের দিনও ব্যাবহার করতে পারেন। সাধারণত, এভাবে টানা দুই দিন ব্যবহার করলে মাথার উকুন সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়ে যায়।
একই পরিবারের সবাই একই সাথে এই ওষুধ ব্যাবহার করলে সবচেয়ে ভাল ফল পাওয়া যাবে।
এছাড়াও, বাজার থেকে উকুনের চিরুনি কিনে এনে, তা দিয়ে চুল আঁচড়াতে পারেন। প্রথমে পরিষ্কার পানি দিয়ে চুল ভেজাতে হবে, কারন ভেজা চুলে উকুন নড়াচড়া করতে পারে না। এরপর ভালোভাবে উকুনের চিরুনি দিয়ে চুল আছড়ে উকুন ফেলে দিতে হবে। সাধারনভাবে আমরা যখন চুল আছড়াই, তখন বড় উকুন সব পড়ে গেলেও ছোট উকুন কিংবা উকুনের ডিম গুলো থেকে যায়। তাই যদি ৩ দিনের গ্যাপ দিয়ে নিয়মিত ভেজা চুল আছড়াতে যায়, তাহলে একসময় উকুন আর ডিম পড়ার সুযোগ পাবে না এতে করে আপনার মাথা থেকে সম্পূর্ণভাবে উকুন চলে যাবে।
সাধারণত ১৫ দিন এই পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয় অর্থাৎ তিন দিন পরপর ১৫ দিনে মোট ৫ বার এই পদ্ধতি ব্যবহার করতে হবে। যদি পরিবারের অন্য কারো মাথায় অনেক উকুন থাকে, তাহলে তাকেও একই সাথে এই পদ্ধতি ব্যবহার করে চুল আঁচড়াতে হবে। তাহলে পুরো পরিবারের সবার মাথা থেকে উকুন ধ্বংস হয়ে যাবে।
উকুন প্রতিরোধের কিছু নিয়মঃ
১। উকুনের সমস্যা পুরোপুরি দূর করতে, একই পরিবারের সকল সদস্যদের, এমনকি কাজের লোক সহ, সবাইকে একইসাথে উকুন মারার ওষুধ ব্যাবহার করতে হবে।
২। উকুনের এই সমস্যা প্রতিরোধ করতে, আক্রান্ত ব্যক্তির থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। যেমন, আক্রান্ত ব্যক্তির কাছাকাছি যাওয়া চলবে না, আবার আক্রান্তের ব্যবহার করা জিনিসপত্র থেকেও দূরে থাকতে হবে।
৩। খেলার সময় শিশুরা যেন অন্যদের মাথা বা গায়ে, তাদের মাথা না ঘষে, এ ব্যাপারে তাদের শিক্ষা দিতে হবে।
৪। বাচ্চারা যেন স্কুলে তাদের জামাকাপড়, টুপি, স্কার্ফ, রুমাল, তোয়ালে, চুলের ব্রাশ ইত্যাদি ভাগাভাগি না করে, সে বিষয়ে তাদের পরামর্শ দিতে হবে।
উকুন মারতে অনেকে মাথায় অ্যারোসল বা কিটনাশক স্প্রে করেন। এটা করা যাবে না। কারণ, কিটনাশক এক ধরনের বিষ, যা পোকামাকড় মারতে ব্যবহার হয়। এই কিটনাশক ত্বকের জন্য যেমন ক্ষতিকর, তেমনি বিষাক্ত বলে স্বাসপ্রশ্বাসের জন্যেও মারাত্মক ক্ষতিকর।
এই লেখার উদ্দেশ্য চিকিত্সা নয়, শুধুমাত্র সচেতনতা বৃদ্ধি করা। কোন ভাবেই এটিকে প্রেসক্রিপসন বা রেফারেন্স হিসেবে ব্যবহার করা যাবেনা।
যেকোনো রোগ বা সমস্যার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
…….. তিনা শুভ্র ।।
