১
প্রতিদিন ঘুম থেকে উঠে লীনার শীতল কপালে একটা আবেগী চুমু দেয় রাকিবুল হাসান, তারপর ডিপফ্রিজের ডালাটা বন্ধ করে অফিসে চলে যায়।
২
একটা খুট খুট শব্দে রাকিবের ঘুম ভেঙে গেলো। এখনো ভোর হয়নি, ঘরের ভেতর ঘুটঘুটে অন্ধকার। এর মধ্যেই খুট খুট শব্দ হয়ে চলেছে অবিরাম। রাকিব নিশ্চিত হলো, ঘরে আবার ইঁদুর ঢুকেছে।
লীনা যখন বেঁচে ছিল, একবার রাকিব আঠার ফাঁদ দিয়ে ইঁদুর ধরলো। সকালে ঘুম থেকে উঠে সে যখন দেখলো আঠায় আটকে ইঁদুর ছটফট করছে, জামানের অন্তরটা জুড়িয়ে গেলো – ভাবখানা এমন যে “অনেক ঝামেলা করেছো বাছা, এবার তোমাকে আরাম করে পিটিয়ে মারবো”।
কিন্তু তার পরিকল্পনায় বাঁধ সাধলো লীনা। সে বায়না ধরলো “এত্ত কিউট একটা এনিম্যাল” কে মারা যাবে না, কোনোভাবে আঠা ছাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে তারপর ওটাকে বিল্ডিঙের বাইরে কোথাও ছেড়ে দিয়ে আস্তে হবে।
“লীনা, শোনো, একে ছাড়ানো যাবে না। আইদার ওয়ে তাকে মরতে হবে, পিটিয়ে মারলে ওর জন্য সহজ হবে। এমন জোরে বাড়ি দিবো, ও বোঝার আগেই মরে যাবে।’
সেই কথা শুনে লীনার সে কি কান্না, ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না থামাতেই পারে না। শেষে ওই আঠা-লাগানো অবস্থাতেই লীনা ওটাকে খাওয়া দিয়ে যেতে লাগলো। কি অদ্ভুত দিন ছিল সেগুলো!
খুট খুট শব্দটা থামছিল না বলে রাকিব বিছানাতে উঠে বসলো, আর তখনি দেখলো মেয়েটাকে। অন্ধকারের মধ্যে কিছু অংশ যেন একটু কম অন্ধকার, আর ওটা যেন এক তরুণীর আকৃতি নিয়ে ঘরের একপাশ থেকে অন্য পাশে সরে গেল। পাশের ঘর থেকে আসা মৃদু আলো অবয়বটার ওপর পড়তেই রাকিব ওকে চিনতে পারলো।
এটা যে লীনাই সে ব্যাপারে তার কোন সন্দেহ নেই। আগের মতোই মাঝে মাঝে সে আসে রাকিবের কাছে। আগের মতোই মাঝে মাঝে তার দেখা পায় রাকিব। একটা সবুজ জামা পরে আছে সে। গত ঈদে কিনেছিলো।
“কি? এত ভোরে উঠে বসে আছো কেন?” – ঘাড়ের ওপর থেকে কালো চুলগুলো পিঠের পেছনে ঠেলে দিয়ে লীনা বললো।
“ইঁদুর। ঘরে মনে হয় ইঁদুর ঢুকেছে।”
“এগুলি সবই তোমার মনের ভুল, রাকিব। আমি তোমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছি, তুমি ঘুমাও।”
রাকিব লক্ষ্মী ছেলের মতো বালিশে মাথা রাখলো। লীনা ওকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়লো ওর বাঁ পাশে। ফ্যানের বাতাসে ওর চুলগুলো উড়ে উড়ে এসে রাকিবের চোখে-মুখে লাগছিলো। মেয়েটার গা থেকে বিদেশী প্রসাধনের হালকা সৌরভ পেতে পেতে কখন যে রাকিব ঘুমিয়ে পড়লো সে নিজেও জানে না। সেই ঘুম ভাঙলো কলিংবেলের শব্দে। লাল টেবিল ঘড়িতে তখন সোয়া নয়টা বেজেছে মাত্র।
ইন্সপেক্টর জয়নাল জামাল এসেছেন। একাই এসেছেন। পুলিশ সুলভ দীর্ঘকায় ভদ্রলোক, কিন্তু চোখ দুটো নিরীহ। তাকে দেখলে রাকিবের মোটেও ভয় লাগে না, কিন্তু দেখা হলেই ভদ্রলোক অনেক প্রশ্ন করেন।
এই যেমন, আজকেও খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করলেন লীনার কথা। মনে করিয়ে দিলেন, তার মা-বাবা ফোন করে পাচ্ছে না লীনাকে, প্রায় এক সপ্তাহ হয়ে গেলো এ নিয়ে সুতরাং তারা যারপরনাই চিন্তিত, ইত্যাদি, ইত্যাদি।
রাকিব যথারীতি জানালো, সে এ বিষয়ে কিছুই জানে না, এক সপ্তাহ আগে লীনা তার সাথে রাগ করে বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে, বলে গেছে বাবার বাড়ি যাবে, আর তার ঢাকা থেকে নারায়ণগঞ্জ বাসে মাত্র এক ঘন্টার পথ।
“আপনি যোগাযোগের চেষ্টা করেন নি?”
“আমি কেন যোগাযোগ করবো? সে আমার সাথে দেমাগ দেখিয়ে বাসা থেকে চলে যাবে, আর আমি তার রাগের কারণ নিয়ে গবেষণা করবো, এত সময় আমার নেই।”
“এক সপ্তাহের বেশি হয়ে গেল, আপনার স্ত্রীর খবর নেই। আপনার এ নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই?”
“আছে, থাকবে না কেন? কিন্তু আমি তো আর গোয়েন্দা না যে তাকে রাস্তায় রাস্তায় খুঁজে বেড়াবো।”
“আপনাকে দেখে তো মনেও হচ্ছে না আপনি চিন্তিত। আপনার ব্যবহার দেখলে মনে হয় যেন কিছুই হয় নি।”
রাকিব কিছু বললো না।
ইন্সপেক্টর জামাল উঠে দাঁড়ালেন – “আপনি কি বুঝতে পারছেন, সন্দেহের তালিকায় আপনি বেশ ওপরের দিকেই আছেন?”
রাকিব মাথা নাড়লো, সে বুঝতে পারছে যে সে পুলিশের সন্দেহের তালিকায় আছে।
দরজা থেকে বের হওয়ার সময় ক্ষনিকের জন্য থমকে দাঁড়ালেন জামাল সাহেব, পেছনে না তাকিয়েই বললেন – “পরের বার যখন আসবো, সার্চ ওয়ারেন্ট নিয়েই আসবো। ও, ভালো কথা, আপনি কিন্তু মেট্রোপলিটন এরিয়ার বাইরে যেতে পারবেন না। চিঠি এখনো ইস্যু হয় নি, তবে আজকালের মধ্যে সেটা হয়ে যাবে। যতই চালাকি করেন, এই জামালউদ্দিনের কাছ থেকে সহজে আপনি ছাড়া পাচ্ছেন না, জনাব, প্লিজ মনে রাখবেন সেটা।”
জামাল সাহেব চলে যাওয়ার পর রাকিব চুপচাপ সোফার ওপর বসে রইলো। ঘরের ভেতর থেকে তখন কাপ-পিরিচের শব্দ আসছিলো। একটু পর লীনার কণ্ঠস্বর শুনতে পেলো রাকিব – “কে এসেছিলো, রাকিব?”
“কেউ না। কেউ না।” – নিজ মনেই বিড় বিড় করতে লাগলো রাকিব।
৩
এতদিন ধরে এই জিনিসটা সারা দুনিয়া থেকে গোপন রেখেছিলো রাকিব। এক বিয়ে করে সম্পূর্ণ ভিন্ন দুইজন লীনাকে একসাথে অধিকার করেছিল রাকিব।
এক লীনা ওর স্বপ্নকে পরিণত করতো বাস্তবে, আরেক লীনা তার বাস্তবকে পরিণত করতো স্বপ্নে। একজন লীনার বাস ছিল রাকিবের বিছানায়, সে অফিস করতো রান্নাঘরে, আর একসাথে সকালের নাস্তা কিংবা রাতের খাবার খেত ডাইনিং রুমে। অন্য লীনা থাকতো রাকিবের লাইব্রেরি ঘরে, মাঝে-মধ্যে তাকে দেখা যেত ড্রইংরুমে বসে কবিতার বই পড়ছে।
বিরল কিছু সময়ে তাদের দুজনকে একসাথেও দেখতে পেতো সে। দুপুরে হয়তো লীনা বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে বান্ধবীর সাথে ম্যারাথন আড্ডা দিচ্ছে, রাকিব ড্রইংরুমে গিয়ে দেখে দ্বিতীয় এক লীনা টিভিতে মিকিমাউসের কার্টুন দেখছে। একবার লীনার সাথে সে ড্রইংরুমে বসে অনুযোগ করলো অফিসের ঝামেলা নিয়ে – সেদিন তার বস খামোখাই সবার সামনে তাকে অপমান করেছিল মিটিংয়ের মধ্যে – আলাপ শেষে বেডরুমে গিয়ে দেখে আরেকটা মেয়ে ঘুমিয়ে আছে ওই ঘরে, তাকে দেখে বললো – “লাইট জ্বালালে কেন? উফফ, চোখটা মাত্র লেগেছিল।” ড্রইংরুম থেকে তখনও কিন্তু ওই লীনার চুড়ির মৃদু শব্দ ভেসে ভেসে আসছে।
বহু বছর আগের কথা এসব, কিন্তু কাউকে কোনোদিন কিছু বলে নি রাকিব। পুরো বিষয়টাকে রাকিব নিয়েছিল স্রষ্টার অন্যতম এক নেয়ামত হিসেবে। দুইজন স্ত্রীর একজন তার সমস্ত কামনা-বাসনাকে মূল্য দেয়, আর অন্যজন তার সব কথা মন দিয়ে শোনে। ফলে তার রবের কোন কোন নেয়ামতকে অস্বীকার করবে, রাকিবের জানা ছিল না।
হ্যাঁ, এই দুই লীনা একজন অন্যজনকে সচেতনভাবে এড়িয়ে চলতো, যেন একজন অন্যজনের সতীন। একজন কখনোই তার পড়ার ঘরে যেতোনা, তার গল্পের বইগুলো ছুঁয়েও দেখতোনা, সেগুলো নিয়ে আলাপচারিতা তো দূরের কথা। আর অন্যজন কখনোই রাকিবের শোবার ধরে আসতো না, যেন নিষিদ্ধ এক পল্লী সেই ঘর, যেন ওই ঘরে গেলে তার পাপ হয়ে যাবে। কিন্তু এসবকিছুতে রাকিবের আপত্তি থাকার কোন কারণ ছিলোনা, কেননা দুই লীনাকে নিয়ে তার দিন-কাল বেশ ভালোভাবেই কেটে যাচ্ছিলো।
দুই লীনাকে নিয়ে রাকিবের দিনগুলো ভালোভাবেই কেটে যাচ্ছিলো। কিন্তু যায় দিন ভালো, আসে দিন খারাপ। তখন তাদের তিনজনের বিয়ের সাত বছর হয়েছে, রাকিব আর লীনার সংসারে তখনো পর্যন্ত কোন সন্তান আসে নি। অনেক চেষ্টা করেছে তারা, কিন্তু একজন অন্যজনকে দোষ দেয়া ছাড়া আর কোন সমাধানে আসতে পারে নি।
বিয়ের অষ্টম বছরে এসে লীনার মনে হতে শুরু করলো, রাকিব তাকে যথেষ্ট সময় দিচ্ছে না। তার অভিযোগের লিস্টি দিন দিন লম্বা হচ্ছিলো – “তুমি সারাদিন লাইব্রেরিতে পড়ে থাকো”, “আমি মোটা হয়ে গেছি বলে তোমার আমাকে আর ভালো লাগে না, আমি বুঝি”, “তুমি একটা হিপোক্রাট”, ইত্যাদি, ইত্যাদি। কিন্তু বিষয়টা সীমা ছাড়িয়ে গেলো, যেদিন লীনা রাকিবের নীল শার্টের কলার চেপে ধরে বললো – “তুমি কিন্তু ওকে অতিরিক্তরকম বেশি সময় দিচ্ছো। আমি কিন্তু এসব সহ্য করবোনা।”
বলাবাহুল্য, লীনারা অবগত ছিল একজন অন্যজন সম্পর্কে, যদিও একজন অন্যজনের ছায়া মাড়াতো না।
“কি করবে তুমি আমি যদি ওকে বেশি সময় দিই?” – রাকিব শান্তস্বরে জানতে চাইলো।
লীনা হেসে উঠলো, সন্ধ্যার আধো অন্ধকার লীনার দৃষ্টিকে রাকিবের কাছে ভীষণ ক্রূর মনে হলো। কিন্তু তখনো সে জানতো না কি ভয়াবহ এক পরিকল্পনা লুকিয়ে আছে প্রথমা লীনার সেই হাসির পেছনে। টের পেলো সে ঠিক দুই রাত পরে।
সেদিন ছিল বুধবার। রাকিব দ্বিতীয়া লীনার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে ছিল ড্রইংরুমে বেতের সোফায়। মেয়েটা রাকিবের চুলে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিলো আর বলছিলো – “চিন্তা করোনা, সব ঠিক হয়ে যাবে। খুব শিগগিরই ভালো কোন খবর পাবে তুমি। আবার সব কিছু তখন আগের মতো হয়ে যাবে। বিপদের সময় ধৈর্য ধরতে হয়।” রাকিবের তখন মনে হচ্ছিলো এই মেয়েটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ, একে কোনোভাবেই হারিয়ে যেতে দেয়া যাবে না।
বাইরে তখন বেশির ভাগ বাসার হলুদ লাইট বন্ধ হয়ে গেছে। পাড়ার বেশির ভাগ লোকই অন্ধকারের ভেতর মেতে উঠেছে প্রেমে কিংবা নিদ্রায়। এই শুনশান নীরবতা ভেঙে গেলো ধাম করে দরজা খুলে যাওয়ার শব্দে। রাকিব উঠে বসে, দ্বিতীয়া সতর্ক হয়, কেননা ঝড়ের বেগে তখন ড্রইংরুমে এসে ঢুকেছে প্রথমা। তার হাতে মাংস কাটার বড় ছুরি, মাথার কালো চুলগুলো সব এলোমেলো, চোখ দুটো রক্তের নেশায় লাল। অথচ প্রথমা লীনা সবসময়ই বসার এই ঘরকে সচেতনভাবে এড়িয়ে চলে, টেবিলের ওপর ছড়ানো-ছিটানো পুরোনো বইয়ের কারণে তার এলার্জির মতো হয়ে শরীর চুলকাতে থাকে বলে।
“এই তোমার কি হয়েছে? তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে?” – ধমকের সুরে বলে উঠলো রাকিব। সে ততক্ষনে সোজা হয়ে উঠে বসেছে। দ্বিতীয়া লীনাও সতর্ক হয়ে শিরদাঁড়া সোজা করে বসেছে।
“আমি ওকে খুন করে ফেলবো। আমার জীবনের সমস্ত সমস্যার মূল এই মেয়ে। ওর কারণেই তুমি আমাকে সময় দিচ্ছ না। ওর কারণেই আমাদের ঘরে সন্তান আসছে না।” – বলে প্রথমা ঝাঁপিয়ে পড়লো দ্বিতীয়ার ওপর। কিন্তু রাকিব ততক্ষনে উঠে দাঁড়িয়েছে, সে একপাশে সরে গিয়ে পাশ থেকে জাপ্টে ধরলো লীনাকে।
“আরে, করছো কি তুমি এসব? এরকম পাগলামি করলে তো আমি ওকেও হারাবো তোমাকেও হারাবো।” – হাঁপাতে হাঁপাতে বললো রাকিব। সে ছুরিসহ লীনার ডান হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রেখেছে।
“আমি হারিয়ে যেতে আসিনি” – রাকিবের কাছ থেকে নিজের হাত ছাড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে সাপের মতো হিসহিসিয়ে বললো লীনা – “ওকেই হারিয়ে যেতে হবে।”
সে ছুরিসহ লীনার ডান হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে রেখেছে। সে দৃঢ়স্বরে বললো – “আরে গাধা, ওকে মারলে ও যাবে কবরে, আর তুমি পচবে জেলে।”
“আমাকে জেলে যেতে হবে না,” – হেসে উঠলো প্রথমা – “এই ঘরে যে দুইজন লীনা আছে, সেটা তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ তো জানে না।”
রাকিব ততক্ষনে কায়দা করে লীনার হাত থেকে ছুরিটা মেঝেতে ফেলে দিতে পেরেছে। সে লীনাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললো – “আমি তোমাদের দুজনের একজনকেও হারাতে চাই না।”
হাত থেকে ছুরি পরে যাওয়ার পর লীনা তখন কিছুটা শান্তছে। রাকিব তাকে প্রায় ঠেলতে ঠেলতে বেডরুমে নিয়ে এলো, তারপর দরজার ছিটকিনিটা তুলে দিয়ে দরজার সামনে পাহারাদারের মতো দাঁড়িয়ে রইলো। লীনা বালিশে মুখ গুঁজে কিছুক্ষন কাঁদলো, চরম অভিমান হলে অনেক স্ত্রীই যেরকমটা করে থাকে, তারপর একসময় ঘুমে তলিয়ে গেলো। তখন তাকে দেখতে ছোট্ট একটা শিশুর মতোই লাগছিলো।
সেই রাতের পর থেকে রাকিবের জীবন থেকে সমস্ত শান্তি উধাও হয়ে গেলো। দ্বিতীয়াকে হারানোর কথা সে চিন্তাও করতে পারে না। সত্যি কথা বলতে কি, প্রথমাকে ছাড়া সে বাঁচতে পারবে, কিন্তু দ্বিতীয়াকে ছাড়া সে একদিনও টিকতে পারবে না। দ্বিতীয়া না থাকলে কে তার সমস্ত অনুযোগ শুনবে, কে তাকে বিপদে স্বান্তনা দেবে, আর কেই বা তার মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দেবে? কিন্তু রাকিব খুব ভালো করেই জানে, একবার যখন প্রথমা তাকে হত্যার চেষ্টা করেছে, আবার সে সেটা করবে।
কি করবে, কি করবে, ভাবতে ভাবতে একটা সমাধানই রাকিবের মাথায় এলো। সমাধানটা যদিও তীব্র ধরণের, কিন্তু জীবনে কখনো কখনো কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয় – সম্পর্কে পুরোপুরি পচন ধরার আগেই সেটা থেকে বের হয়ে আসতে হয়, ঠিক যেভাবে লাশ থেকে গন্ধ বের হওয়ার আগেই সেটা কবর দিয়ে ফেলতে হয় – সে লাশ যত বড় প্রিয়জনেরই হোক না কেন। আর দুই লীনার মধ্যে কাউকে বেছে নিতে হলে কাকে সে বেছে নেবে, এ বিষয়ে রাকিবের মনে বিন্দুমাত্র দ্বিধা কিংবা দ্বন্দ্ব ছিল না।
জুলাই মাসের তেরো তারিখে রাত তিনটার দিকে লীনার মুখে বালিশ চাপা দিয়ে রাকিব ধরে রাখলো, যতক্ষণ পর্যন্ত না তার নিচে মেয়েটার শরীর স্থির হয়ে আসে। প্রাণহীন শরীরটাকে টেনে নিতে খুব একটা কষ্ট হলো না, তবে ডিপফ্রিজ খালি করে সেটাতে বসাতে রাকিবকে বেশ কিছুটা বেগ পেতে হলো। এই ফ্রিজগুলোর দরজা পাশাপাশি খোলা গেলে তাকে এতটা কষ্ট করে ওপরে তুলতে হতো না, আর বসানোর সময়ও এতটা ঝামেলা হতো না।
সেই থেকেই লীনার লাশ সযত্নে সংরক্ষিত আছে ডিপফ্রিজটায়। প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে লীনার শীতল কপালে একটা আবেগী চুমু দেয় রাকিব, তারপর ডিপফ্রিজের ডালাটা বন্ধ করে অফিসে চলে যায়। গত এক সপ্তাহ ধরে রুটিন করেই এই কাজ করছে রাকিব, কারণ লীনাকে এখনো সে আগের মতোই ভালোবাসে।
৪
প্রথমা মারা যাওয়ার পর রাকিবের ভয় হয়েছিল, দ্বিতীয়াও তাকে ছেড়ে চলে যাবে অজানা গন্তব্যে। কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে সেটা হয় নি। দ্বিতীয়া এখনো আগের মতোই বিচরণ করে রাকিবের পড়ার ঘরে আর ড্রইংরুমে, আগের মতোই সে সযত্নে এড়িয়ে চলে রান্নাঘর আর রাকিবের বিছানা।
রাকিবের একটাই ভয়, পুলিশ যদি এসে তার বাড়িতে সার্চ করে তাহলে তো সে ধরা পড়ে যাবে। লাশ তারা নিয়ে যাবে, ময়না তদন্ত করবে। একমাত্র উপায় হলো দ্বিতীয়া লীনাকে পুলিশের কাছে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু এই লীনা তো বাসা থেকে বের হয় না, তার একমাত্র অবস্থান হলো রাকিবের পড়ার ঘর আর খুব ব্যতিক্রমী কোন কোন দিন তার বসার ঘরে। আর সেটাও নির্ভর করে দ্বিতীয়ার মর্জির ওপর। যদি পুলিশ তার বাসা রেইড দেয় আর দ্বিতীয়া পুলিশের সামনে না আসে? যদি সে লুকিয়ে থাকে লাইব্রেরির পেছনে, আর তল্লাশি চলে যায় ডিপফ্রিজটা পর্যন্ত? তখন কি হবে? রাকিব জানে না, জানতে চায়ও না। কিন্তু এসব ভেবে ভেবে আজকাল রাতে তার ধুম আসে না, ধুম আসে না।
৫
প্রথমার মৃত্যুর সপ্তাহ দুয়েক পড়ে কথা। শনিবার রাতে বাসায় ফিরে রাকিব দেখে, গেটের সামনে পুলিশের একটা জীপ। ছোটবেলা থেকে পুলিশের এই একই গাড়ি দেখে এসেছে সে। কত সালের গাড়ি, কে জানে।
তাকে গেট খুলতে দেখে জীপ থেকে নেমে এলেন ইন্সপেক্টর জামাল। তার কাঁধে হাত রেখে বললেন – “রাকিব সাহেব, এই নিন আপনার সার্চ ওয়ারেন্ট। আপনার বাসা আমরা তল্লাশি করবো। তারপর আপনাকে একটু থানায় যেতে হবে।”
রাকিব অবাক হলো না, বললো – “তল্লাশির পর কি আমাকে গ্রেফতার করবেন?”
“জি, সেটার জোর সম্ভাবনা আছে।”
“ঠিক আছে, চলেন।”
জামাল গাড়ির দিকে ফিরে কাকে যেন ইশারা করলেন, হাতকড়া হাতে নেমে এলো একজন দুর্বল স্বাস্থ্য কনস্টেবল – যার বুকের ব্যাজে লেখা আছে “কনস্টেবল করিম”। পাশে পুরোনো বন্দুক কাঁধে আরেকজন। এইসব বন্দুক কাজ করে কিনা, রাকিব নিশ্চিত হতে পারলো না।
রাকিব বাধ্য ছেলের মতো আগে থেকেই হাত বাড়িয়ে গেট খুলে এগুলো সিঁড়িঘরের দিকে। যা হবার হবে। এত ভেবে কি জীবন চলা যায়? তিনতলায় পৌঁছে চাবি ঘুরিয়ে খুলে ফেললো ফ্ল্যাটের দরজা। বাসায় ঢুকেই ড্রইংরুম, সেখানে রাকিবের পা পড়লো প্রথমে, আর তাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে তার প্রায় সাথে সাথে দুইজন কনস্টেবল সমেত ঢুকে পড়লেন ইন্সপেক্টর জামাল। কিন্তু ঘরে ঢুকেই চমকে যেতে হলো সবাইকে, নাটকের সবগুলো চরিত্রকে হঠাৎ করেই থেমে যেতে হলো যেন স্ট্রিমিংয়ের মাঝখানে হ্যাং হয়ে গেছে লাখোবার দেখা কোন ইউটিউব ভিডিও। থেমে যেতে হলো তাদেরকে, কেননা তারেকের সামনে ওই বেতের সোফায় সাদা শাড়ি পড়ে বসে আছে লীনা নিজে। রাকিবের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
সে রাতে কর্মঠ ও কৌতূহলী পুলিশ বাহিনী অনেক্ষন অবস্থান করলো তিনতলার বসার ঘরে। লীনার সাথে ইন্সপেক্টর জামাল সাহেবের পরিচয় করিয়ে দিলো রাকিব। লীনাকে বেশ কিছুক্ষন ধরে জিজ্ঞাসাবাদের পর জামাল নিশ্চিত হলেন, এটা সত্যিই লীনা।
সে সন্ধ্যায় পুরোপুরি দ্বিধাগ্রস্থ না হওয়া পর্যন্ত ইন্সপেক্টর জামাল বসে রইলেন রাকিব আর লীনার বসতবাড়ির ড্রইংরুম জুড়ে। যাবার আগে লীনাকে অনুরোধ করলেন ইন্সপেক্টর, যেন তার বাবা-মার সাথে ফোনে কথা বলে লীনা – তারা তাকে নিয়ে ভীষণ চিন্তিত আছেন। মিষ্টি হেসে লীনা তাকে জানিয়ে দিলো, সে সেটা অবশ্যই করবে।
সেই থেকে এই অন্য লীনার সাথে সুখে-শান্তিতে দিন কাটাচ্ছে রাকিব। সে ততদিনে বুঝে ফেলেছিলো, একটা সাবান কিনলে আরেকটা ফ্রি পাওয়ার মতো একটা বিয়ে করে সে পেয়ে গিয়েছিলো দুইজন স্ত্রীকে – যাদের একজন তার স্বপ্নকে পরিণত করতো জাগরণে, আরেকজন বর্তমানে তার জেগে থাকাকে পরিণত করছে স্বপ্নে। কিন্তু জাগতিক নানান ঝক্কি-ঝামেলার মাঝে কখনো কখনো স্বপ্ন নিয়ে বেঁচে থাকা বাস্তবতার কষাঘাত থেকে অনেক ভালো। কতদিনের এই জীবন, আর খামোখা একে ভীষণ জটিল করে লাভ কি?
