আসর

সন্ধ্যা থেকে টানা তিন ঘন্টা বসে থেকেও কোন রোগী এলো না। আমি অবশ্য সময়টা পড়ালেখা করে কাজে লাগানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করেছি, যদিও কোনকিছুতেই মন বসছিল না।

বাসায় যেতেও একেবারেই মন চাচ্ছে না। গিয়ে আর কি হবে? সেই তো একই প্যানপ্যান, একই ঘ্যানঘ্যান, পারস্পরিক দোষারোপ, সবশেষে দু’জন দু’দিকে মুখ করে ঘুমানোর ভাণ করতে করতে দুঃস্বপ্নের রাতের ভেতর ডুবে যাওয়া।

সেই কখন থেকে মেডিকেল জার্নালগুলোতে চোখ বুলাচ্ছি, প্রতিটা অক্ষর পড়ে চলেছি, কিন্তু একটা শব্দেরও অর্থ আমার মস্তিষ্কের কোষগুলোতে আলোড়ন তুলছে না। শেষে যখন উঠে যাবার কথা ভাবছি, ঠিক সে মুহূর্তে লোকটা ঘরে এসে ঢুকল। ঢোকার আগে নক করা সাধারণ ভদ্রতা, সে ভদ্রতাটা সে করে নি।

“কোনভাবে সাহায্য করতে পারি?” – যথেষ্ট অনীহা নিয়ে প্রশ্ন করি আমি। সে কোন রোগী হলেও আমার কিছু এসে যায় না, বাসায় গিয়ে মাথাধরার দুটা অষুধ খেতে পারলেই তখন বাঁচি আমি।

“আমার নাম মিনহাজ, আপনিই তো ডাক্তার রাফিজ ইমতিয়াজ, তাই না?” – লোকটা হাতের ব্যাগটা নিচে নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল।

আমি মাথা নাড়লাম।

“তাহলে আমি ঠিক জায়গাতেই এসেছি।” – সে সামনের চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসল। আমার মনে হল, এর বয়স পয়ত্রিশ কিংবা চল্লিশ হবে। লম্বাটে গড়ন, দেখতে বেশ সুদর্শন।

“আমি কিন্তু বেরিয়ে যাচ্ছিলাম।” – আমি জানিয়ে দিলাম।

“স্যরি, ডাক্তার সাহেব, কিন্তু আমার বিষয়টা জরুরী।”

“ভাই, আমি পুরোপুরি সুস্থ নই – মাথা ব্যথা করছে, যত রাত হবে এটা বাড়বে। আমি সম্ভবত চাইলেও আপনাকে সময় দিতে পারবনা।

সে চুপ হয়ে গেল, তারপর কি ভেবে বলল – “তাহলে হয়তো ব্যাপারটার এখানেই শেষ . . .”

“এখানেই শেষ মানে?” – আমি জানতে চাই।

“চার বছর হয়ে গেল, কারো সাথে শেয়ার করা হয়নি। আজ হঠাৎ মনে হল আপনার সাথে শেয়ার করি – পৃথিবীতে কেউ একজন অন্তত: জানুক আমার বিষয়টা। কাল হয়তো আবার আমি আগের অবস্থায় ফিরে যাব, কারো সাথে শেয়ার করতে ইচ্ছে করবে না। অথবা অদ্ভুত ঘটনাগুলিই বন্ধ হয়ে যাবে।”

কৌতূহলের কাছে আমার ক্লান্তি হার মানল, আমি তাকে বসতে বললাম। তারপর ড্রয়ার থেকে দুইটা প্যারাসিটামল নিয়ে একবারে খেয়ে ফেললাম। তারপর দুই মিনিট টানা চোখ বন্ধ করে বসে থাকলাম। এই সময়টা মিনহাজ একটা কথাও বলল না।

মিনিট দুই পর চোখ খুলে তাকালাম – সে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে আমার দিকে। আমার মাথাব্যথা কমার কোন লক্ষণ দেখলামনা, তবু লোকটাকে সময় দেবার সিদ্ধান্ত নিলাম। ফ্লাস্কে অল্প কিছু চা ছিল, গরম কমে গেছে, সেটাই গ্লাসে ঢালতে ঢালতে জানতে চাইলাম – “তা আমার কাছেই কেন?”

লোকটা হাসল, অমায়িক সুন্দর হাসি – “শুনেছি আপনি অতিপ্রাকৃত বিষয় নিয়ে কাজ করেন, আমি এমন কাউকে খুজছিলাম যে একইসাথে মানসিক বিশেষজ্ঞ আবার অতিপ্রাকৃত ব্যাপারও বোঝে। আপনিই একমাত্র লোক যার এমন অভিজ্ঞতা আছে।”

আমি হেসে ফেললাম – “আপনি ভুল শুনেছেন, আমি অতিপ্রাকৃত ব্যাপার-স্যাপার একেবারেই বুঝি না। হ্যাঁ, একবার এক স্কিজোফ্রেনিক মহিলাকে নিয়ে কাজ করেছিলাম, পরবর্তীতে সেটার অপব্যাখ্যা করে একটা ভুল কাহিনী কোনভাবে প্রচার হয়। পুরো ব্যাপারটাই অতিরঞ্জন।”

“ভাই, আমি ভালো করে খোঁজ নিয়েই এসেছি। আপনার কথা জেনেছি এক বছরেরও বেশি হয়, কিন্তু আসার ব্যাপারে মন ঠিক করতে পারছিলাম না।”

আমি গোপনে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলি – “আচ্ছা, বলুন আপনার সমস্যার কথা।”

“এটাকে ঠিক সমস্যা বলা যাবে কি না, আমি জানি না।” – মিনহাজ বলতে শুরু করল – “আর এর কোন সমাধান আছে বলেও আমার মনে হয় না। আমি শুধু জানতে এসেছি, এর কোন ব্যাখ্যা আপনার কাছে আছে কিনা।”

মাথাব্যথা নিয়েই আমি মিনহাজ সাহেবের তথাকথিত সমস্যা মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করি।

“হাই স্কুলে পড়ার সময় থেকেই আমি লক্ষ্য করেছি, মাঝে মাঝে আমার শরীরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় অন্য কেউ। যখন এটা হয়, আমি কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে চলে যাই, তারপর অনেকক্ষণ পরে যখন আমার সম্বিৎ ফিরে আসে তখন দেখি যে আমি একটা কান্ড ঘটিয়ে বসে আছি যদিও ততক্ষনে অনেক দেরি হয়ে গেছে।

একটা উদাহরণ দিলে ব্যাপারটা স্পষ্ট হবে। যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি, সেসময় জ্যৈষ্ঠ মাসের এক রাত্রে অতর্কিতে লোড শেডিং হয়েছিল। গরম লাগছিলো বলে বারান্দায় বসেছিলাম একা। হাওয়া ছিল খুব কম, তাই বেশ হাসফাস লাগছিলো।

আমি সেই সময়ের কথা বলছি, যখন ইন্টারনেট বলে কিছু ছিল না। রাত বারোটার আগেই বিটিভির অনুষ্ঠান সব শেষ হয়ে যেত, ফলের গভীর রাতের বিনোদন ছিল হয় ঘুম না হয় তোষকের নিচে লুকিয়ে রাখা উত্তেজক ম্যাগাজিন। যখন কারেন্ট এলো, তখন বেশিরভাগ লোক এমনিতেই ঘুমিয়ে পড়েছে, কারণ রাত তখন সাড়ে বারোটা হয়ে গেছে।

পাড়ার নিরানব্বই ভাগ জানালাই অন্ধকার ছিল বলে আমাদের দুইটা বাড়ি পরে তিনতলার যে ঘরে ডিমলাইট জ্বলছিল, সেটা আমার চোখে আঠার মতো আটকে গেলো। ঘরটার ভেতর আলো মৃদু হলেও দুজন মানুষের নড়া-চড়া আমার চোখ এড়াতে পারছিলো না। ছায়া দুটাকে ঘনিষ্ঠ হতে দেখে আমি মনের চোখে আন্দাজ করে নিতে সক্ষম হলাম, ওদের মধ্যে কোনটা নর আর কোনটা নারী।

সেই রাতের পর থেকে প্রতিদিন রাতে বারোটার পর কেউ আমাকে সম্মোহিতের মত নিয়ে যেত বারান্দার ওই কোনটায়। বিড়ালের মতো নিঃশব্দে একটা টুল টেনে বসে থাকতাম, রাত একটা – কখনো কখনো দেড়টা – পর্যন্ত। যদিও আর কোনোদিন ওই দৃশ্য আমি দেখতে পাইনি, তবু প্রতিরাতে রুটিন করে বারান্দায় গিয়ে বসতাম আমি। ওই শয্যা দেখার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায় জানার পরও যে আমি ওখানে গিয়ে রাতের পর রাত বসে থাকতাম, এটাই প্রমান করে যে যুক্তি-বুদ্ধি আমাকে নিয়ন্ত্রণ করছিল না সে রাতগুলোতে, বরং সেই প্রহরগুলোতে আমাকে চালিয়ে নিচ্ছিলো আমার বাইরের তৃতীয় কোন স্বত্ত্বাই।”

এ পর্যায়ে আমি হাত দেখিয়ে মিনহাজ সাহেবকে থামালাম – “আপনি নিজে কি মনে করেন? মানে এই বিষয়ে আপনার নিজের কি মত? ঘটনা আসলে কি হয়েছিল বলে মনে হয় আপনার কাছে?”

সে কাঁধ ঝাকালো – “আমার বন্ধু আব্দুর রাজ্জাক মাদ্রাসায় পড়তো। সে বলেছিলো – এগুলি কারিন জিনের ওয়াসওয়াসা। জীন মানুষকে আসর করলে নাকি এইরকম হয়। সে বলেছিলো মাগরেবের নামাজের পরে তুমি তিন-কুল পড়ে শরীর বন্ধ করে নিতে, তাহলে ভোর হওয়া পর্যন্ত নাকি কোন শয়তান আর আমার শরীরে ভর করতে পারবে না।”

“আপনি তিন-কুল পড়ে শরীর বন্ধ করার চেষ্টা করেছিলেন?”

“জি, করেছিলাম।”

“তাতে কাজ হয়েছিল?” – আমার মাথাব্যথা ততক্ষনে কিছুটা কমতে শুরু করেছে, ডাবল প্যারাসিটামল কাজ করছে বলে মনে হয়।

“না, কিন্তু ঐ রাতগুলোতে আমার শরীরের কন্ট্রোল নিয়ে নেয় শয়তান জীন, এই তথ্যটা জানার পর আমার মনে কিছুটা শান্তি এসেছিলো, অপরাধবোধ কিছুটা কমেছিল। ভাবছিলাম, তাহলে ঐসব পাপকাজের জন্য আমি পুরোপুরি দায়ী না, শয়তান জীন আমার শরীরের দখল না নিয়ে নিলে আমার মতো ভালো ছেলে কোনোদিনই  ঐসব গোপন জিনিস দেখার জন্য অস্থির হয়ে যেতাম না।”

“তিন কুল পড়ে যে কাজ হয়নি, এটা আপনি কখন কিভাবে বুঝতে পারলেন?” – কিছুটা উকিলি জেরার মতো করে জিজ্ঞেস করলাম আমি। 

“পরদিন সন্ধ্যা থেকেই মাগরেবের নামাজের পর আমি তিন-কুল পড়ে নিজের শরীর বন্ধ করতে শুরু করলাম। কোনোদিন ভুল হয় নি। কিন্তু দুইদিন যেতে না যেতেই রাত সোয়া দশটার সময় আবার লোড শেডিং হলো, আর তার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমিও নিজেকে আবার আবিষ্কার করলাম সেই একই ভুল বারান্দায়।

কিন্তু এই নিয়ন্ত্রণের বিষয়টা সবসময় যে অবৈধ আনন্দেরই উৎস ছিল, তা কিন্তু না। ক্লাস এইটের সাথে যেদিন আন্ত:শ্রেণী ফুটবলের ফাইনাল খেলা হচ্ছিলো – মানে যেরকম হতো আরকি আমরা ছোট থাকতে – আর আমরা এক গোলে পিছিয়ে ছিলাম প্রায় পুরোটা সময়, সাতাশি মিনিটের সময় আমার পায়ে বল এলো। আমরা তিনজন তখন ডি-বক্সে, কিন্তু ক্লাস এইটের বাঘা বাঘা সাতজন ডিফেন্ডার আমাদের গার্ড দিয়ে রেখেছে। আমার একমাত্র বিকল্প হলো গোলকিপারকে মারা, কিন্তু সে হাত-পা ছড়িয়ে এমনভাবে শরীরটা বড়ো করে ফেলেছে যে গোলপোস্টের কোন দিক আমি খোলা দেখছিলাম না। ঠিক ওই মুহূর্তে আমার ভেতর আবার ওই ঘটনাটা ঘটলো, আমার শরীরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিলো অন্য কেউ অন্য কোন পৃথিবী থেকে। আমার যখন সম্বিৎ ফিরলো, তখন দেখলাম বলটা প্রতিপক্ষ গোলকিপারের দুই পায়ের মাঝখান দিয়ে ঢুকে গিয়ে ছুটতে ছুটতে আশ্রয় নিয়েছে জালে, আর আমার ক্লাস সেভেনের বন্ধুরা সব আমাকে জাপ্টে চেপে ধরে মেরে ফেলতে চাইছে।

সে ফাইনালে আমরা টাইব্রেকারে জিতেছিলাম, ট্রফি এসেছিলো ক্লাস সেভেনের ঘরে। কিন্তু আমি কাউকে বলিনি যে আমার ওই গোলটাতে আসলে আমার কোন কৃতিত্ব ছিল না, বরং একটা ঘোরের ভেতর কেউ একজন আমাকে দিয়ে করিয়ে নিয়েছিল ওই গোলটা।”

“আপনার ধারণা, জীন আপনাকে দিয়ে ওই জয়সূচক, আই মিন, ড্র-সূচক গোলটা করিয়ে নিয়েছিল?”

“সেই সময় আমার সেরকম ধারণাই ছিল। আর দেখেন ডাক্তার সাহেব, এরকম উপকারী জীন কিন্তু অনেকের সাথেই থাকে। আমরা যখন খুলনা থাকতাম, আমাদের বাসায় কাজে সাহায্য করার জন্য আসতো জাহানার মা। এই মহিলাকে কোন কাজ দেয়ার পাঁচ মিনিটের মধ্যে কাজ শেষ হয়ে যেত – সেটা ঘর মোছা হোক, কুটা-বাছা হোক, কাপড় ধোয়া হোক। আম্মা বলতো, জাহানার মা-র সাথে জীন আছে। কিন্তু আমরা এটা নিয়ে চিন্তা করতাম না, কারণ জীন যদি বাসার কাজে সাহায্য করে, তাহলে তাকে অন্তত ক্ষতিকর জীন বলা যাবে না। তাই না?”

মিনহাজ সাহেব এমন প্রত্যয়ের সাথে কথাগুলো বলছিলো, যেন তার যুক্তিগুলোই পৃথিবীর বেশ কথা যা কেয়ামতের আগ পর্যন্ত টিকে থাকবে। সুতরাং তাকে বাঁধা না দিয়ে কথা বলতে দিলাম।  

“যখন কলেজে পড়ি, তখনও মাঝে-মধ্যে অন্য কারো নিয়ন্ত্রণে চলে যেতাম আমি। তখন রহস্যগল্প পড়ার নেশা ছিল আমার, যেকোনো ধরণের থ্রিলার বা ফিকশন গোগ্রাসে গিলতাম – বাংলাদেশী নাকি ভারতীয়, বিজ্ঞান কল্পকাহিনী না ভৌতিক, কিছুই বাছ-বিচার করতাম না। এভাবে পড়তে পড়তে একসময় মনে হলো, একইরকম গল্প বারেবার ঘুরে-ফিরে আসছে, একই ধরণের আইডিয়া চর্বিত-চর্বনের কারণে ক্লিশে হয়ে আসছে কাহিনীগুলো। কিন্তু আমার মনে তখন প্রবল তৃষ্ণা নতুন ধরণের রহস্যগল্প পড়ার, যদিও আমার নাগালের মধ্যের বা সংগ্রহের কোন বইই সেই তৃষ্ণা মেটাতে পারছিলো না।

সেরকম এক তৃষ্ণার্ত রাতে এক কান্ড হলো, মনে হলো আমি অস্পষ্ট একটা কাহিনী দেখতে পাচ্ছি মনের চোখে। স্বপ্নের মতো একটা অনুভূতি ছিল ওটা, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিলো মনের স্ক্রিনে আমি একটা মুভি দেখতে পাচ্ছি, যদিও সেই প্রজেক্টরটা চালাচ্ছে এক অদৃশ্য শক্তি। আমার মন বলছিলো, এখন আমরা একমাত্র কাজ হচ্ছে মনের ভেতর সেই সিনেমাটা দেখে যাওয়া আর যথাসম্ভব সুন্দর শব্দমালা দিয়ে ওটার বর্ণনাটা কোথাও লিখে ফেলা।

একটার পর একটা দৃশ্য খুব দ্রুত গতিতে আসছিলো বলে হাতের কাছে যে কাগজ পেয়েছিলাম, সেটাতেই লিখে ফেললাম আমার প্রথম গল্প। পরদিন সকালে গল্পটা পড়ে স্পষ্টই বুঝতে পারলাম, এটা আমার লেখা না, কারণ এভাবে আমি চিন্তাই করি না। তার মানে ঘোরের ভেতর আমাকে দিয়ে কেউ লিখিয়ে নিয়েছে এই কাহিনী, যদিও আমি জানি না কে সেই লেখক। রহস্যপত্রিকার মিনহাজ ভাই যখন বললেন, আমার এই গল্পটা প্রয়াত শেখ ফজলুল করিমের লেখার মতো হয়েছে, তখন আমার মনে সন্দেহ উঁকি দিয়ে গেলো – হয়তো তার আত্মাই সে রাতে আমার ওপর ভর করে আমাকে দিয়ে লিখিয়ে নিয়েছে করিম সাহেবের অসমাপ্ত কোন গল্পের প্লট।

আমার ওই গল্পটা রহস্যপত্রিকার এপ্রিল সংখ্যাতে ছাপা হয়েছিল। সালটা ছিল ১৯৯৮, আমার এখনো মনে আছে, প্রথমবার ছাপার অক্ষরে নিজের লেখা দেখেছিলাম তো। যা হোক, আমি কিন্তু  কাউকে বলিনি যে ওটা আসলে আমার লিখা না। আমি আসলে নতুন লেখক হিসেবে অন্যদের মনোযোগকে ছোট করতে চাই নি তখন।”

“কিন্তু ওই লেখাটাতো লিখলো মরহুম ফজলুল করিমের আত্মা। আপনার কাঁধের জীন সেটার একসেস পেলো কিভাবে? এ ব্যাপারে আপনার বক্তব্য কি?”

“আমি ঠিক জানিনা, ডাক্তার সাহেব। জানলে তো আপনার কাছে আসতাম না। তবে সেইসময় ভাবতাম, আমার ওপর যে জীনটার আসর আছে, সেটা মৃত লেখকদের আত্মা থেকে তাদের অপ্রকাশিত প্লট নিয়ে এসে আমার মাধ্যমে প্রকাশ করা শুরু করেছে। এতে মৃত আত্মাদেরও লাভ, তাদের গল্পটা প্রকাশিত হলো। হয়তো তারা সেটার ক্রেডিট পেলো না, কিন্তু তাদের ভাবনাটা তো দুনিয়ার মানুষ জানতে পারলো। এক দিক দিয়ে চিন্তা করলে তাদের জন্য এটা মন্দের ভালো।

তাছাড়া আমার রাশি তুলা রাশি। হয়তো এটাও একটা কারণ যে অন্ধকার জগতের বাসিন্দারা আমাকে ঘিরে থাকে। সেটা জীন হতে পারে, অন্য কিছুও তো হতে পারে।”

“অন্য কিছু মানে? কি হতে পারে সেই অন্য কোন কিছু? ভিনগ্রহ থেকে আসা এলিয়েন? টেলিপ্যাথি? কন্সপিরেসি থিওরি, যেমন আপনার ব্রেনের ভেতর কেউ চিপ বসিয়ে দিয়েছে? এরকম কিছু কি ভাবছেন আপনি?”

মনোবিজ্ঞান সম্পর্কে সামান্যতম আইডিয়া যার আছে, সেই বুঝতে পারবে আমি আসলে ততক্ষনে স্কিজোফ্রেনিয়ার লাইনে ডায়াগনসিস করার কথা চিন্তা করতে শুরু করেছি।

“পরের ঘটনাটা শুনলেই আপনি বুঝবেন।” – সে সময় নিয়ে মোহাবিষ্টের বলতে শুরু করলো তার সর্বশেষ ঘটনা।

৩  

“ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় মিলা আসতো আমার বাসায়। সে পড়তো সোসোলজিতে, আমি পড়তাম ফিজিক্সে। থার্ড ইয়ারে স্ট্যাটিস্টিক্স ছিল একটা সাবসিডিয়ারি ক্লাস। সেই ক্লাসেই তার সাথে দেখা, তারপর পরিচয়। সে যে খুব আকর্ষণীয় ছিল, তা না। কিন্তু অনেক্ষন তার দিকে তাকিয়ে থাকলে কেমন যেন একটা নেশা ধরে যেত আমার, মনে হতো কেউ আমাকে সম্মোহিত করে ফেলেছে। আমি ছিলাম চুপচাপ ধরণের, ক্লাসে বসতাম বাঁ সারির সবচেয়ে পেছনের বেঞ্চে, আর মিলা বসতো আমার ডানদিকে এক বেঞ্চ সামনে, ফলে কালো চুলের ফাঁকফোকর দিয়ে উন্মুক্ত হয়ে পড়া তার ঘাড় আর গলা প্রায়ই আমার চোখে পড়তো। আমি চেষ্টা করতাম যেন সে কোনভাবেই এটা খেয়াল না করে, বুঝতে না পারে। কিন্তু মানুষের মনে হয় একটা সিক্সথ সেন্স কাজ করে, আমার কেন যেন মনে হয় সে বুঝতো জানতো যে আমি তাকে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখি। একবার ধরাও পড়ে গেলাম – আমি দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলাম ওকে ছাড়িয়ে সামনের দিকে, যেন সামনের দিকেই আসলে আমি তাকিয়ে ছিলাম, কিন্তু সে মুচকি হাসলো সেদিন।   

এরপর থেকে আস্তে আস্তে মিলার সাথে আলাপ-পরিচয় হলো আমার। সেই উদ্যোগ নিলো, আমাকে তার গ্রূপের সাথে ক্যান্টিনে চা খেতে ডাকলো। তার ছিল অনেক বন্ধু আর বান্ধবী, দশ থেকে বারোজনের একটা দল ছিল যে দলটা সবসময় একসাথে থাকতো, আর আমি তাতে যোগ হলাম অনুসরণকারী হিসেবে। ওর বন্ধুগুলো ছিল বদমাইশ টাইপের, আমাকে ডাকতো ‘টুয়েল্ফথ ম্যান’ বলে।

এক সোমবারদিন সে প্রস্তাব দিলো সে আমার বাসায় আসবে অংক করতে, স্টাটিস্টিক্সের অংক নাকি সে বোঝে না। আমার রাজি না হওয়ার কোন কারণ ছিল না, ফলে রাজি হলাম। সেই থেকে তার সাথে আমার পথচলা শুরু হলো, এমনকি একসময় শুরু হলো পড়ার ফাঁকে ফাঁকে তার আলতো করে আমার ঠোঁটে চুমু খাওয়া তারপর হেসে গড়িয়ে পড়া ইত্যাদি।

এভাবেই চলছিল। দিনগুলো হঠাৎ দ্রুত হয়ে উঠেছিল আমার জন্য। মাস চলে যাচ্ছিলো দিনের মতো, আর দিন চলে যাচ্ছিলো ঘন্টার মতো দ্রুতগতিতে। এমনি এক দিনে আমরা দুজন পড়ছিলাম শেষদিকের একটা চ্যাপ্টার। প্রোবাবিলিটি নিয়ে অংক। মিলে যাচ্ছিলো অঙ্কগুলোর উত্তর, আর সে বিস্ময়ের সাথে দেখছিলো আমার উত্তর মেলানোর দক্ষতা, আর আমি একইরকম বিস্ময়ের সাথে দেখছিলাম তার আঁটোসাঁটো সাদা জামা। বাসায় কেউ ছিল না, আম্মা গিয়েছিলো মার্কেটে, আব্বা ছিল অফিসে, কাজের লোক আসে নি জ্বরের জন্য।

ডাক্তার সাহেব, এমন দিনেই কিনা সেই জিনিস আবার ভর করলো আমার ওপর।”

এটুক বলে সে থামল, তার কপাল ঘেমে উঠেছে। সে একগ্লাস পানি চাইল। আমার কাছে আলাদা কোন গ্লাস ছিলনা, আমি অর্ধেক হয়ে যাওয়া পানির বোতলটা তার দিকে এগিয়ে দিলাম। সে সেটা নিয়ে দুই ঢোক পানি খেল। সে একটু বিরতি নিচ্ছিল, আমিও তাকে সময় দিলাম। আমি ধারণা করলাম – সম্ভবত ভয়ংকর একজন অপরাধী আমার সামনে বসে আছে, যে একটু পরই তার অপরাধের কথা প্রথমবারের মত পৃথিবীর কাছে স্বীকার করবে।

একটু কেশে সে আবার শুরু করল তার কথা। আমি আড়ষ্ট হয়ে বসে ছিলাম।

“সেই দুপুরে কি হয়েছিল সঠিক মনে নেই। তবে যখন জ্ঞান ফিরলো, দেখলাম মিলা তখনও সেন্সলেস। আমি তাকে ডাকি, সে ওঠে না। চোখে-মুখে পানি ছিটালাম, তবু সে উঠলোনা। আমি পড়লাম মহা বিপদে। যে কোন সময় মা চলে আসবে, তখন পড়ব বিপদে।”

“ওই কয়েক ঘন্টার কিছুই আপনার মনে নেই?”

“না। বললাম তো, মাঝে মাঝেই আমার শরীরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় অন্য কেউ। ফলে সেই সময়ের স্মৃতি থাকে ভীষণ ঝাপসা। তবে আমার এটুক মনে আছে আমরা দুজন অনৈতিক কিছু করেছিলাম, আর এটাও মনে আছে সেটাতে মিলার পুরোপুরি সম্মতি ছিল। কিন্তু সমস্যা হলো, কাউকে সেটা বিশ্বাস করাতে পারছি না।”   

“কারো বিশ্বাস-অবিশ্বাসে কি আপনার কিছ আসে যায়?”

“ডাক্তার সাহেব, বহুদিন থেকেই সে আমার সাথে ফ্লার্ট করে আসছে। আমি কিভাবে বুঝবো মিলা এসব চায় না? যা হোক, সেদিন আমরা ধরা পড়লাম, কেননা অনেক চেষ্টা করেও তার জ্ঞান ফিরছিলো না, ফলে তাকে ক্লিনিকে নিতে হলো। ওরা স্যালাইন-ট্যালাইন দিলো পর তার জ্ঞান ফিরলো। সেদিন মিলার বাবা ওকে বাসায় নিয়ে গেলো, পরদিন মিলা থানায় গিয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে আমার বিরুদ্ধে মামলা দিলো।”

“সে কি? সে মামলার কি অবস্থা এখন?”

“মামলা আছে। আমিও পলাতক আছি। কিন্তু ডাক্তার সাহেব, আমার খুব জানার ইচ্ছা, যেটা আমি নিজের  উদ্যোগে করি নি, সেটার জন্য কেন আমি দায়ী হবো?”

ততক্ষনে আমার ধৈর্যচ্যুতি ঘটেছে। মাথাব্যথাটাও ফিরে আসতে শুরু করেছে। শান্ত কিন্তু দৃঢ় স্বরে বললাম – “আপনি আপনার সহপাঠী একটা মেয়েকে রেপ করলেন – আমি এটাকে রেপই বলবো, স্পষ্টতই ওর সম্মতি ছিল না এতে – আর এখন আপনি ভাণ করছেন আপনার শরীরে জীন ভর করে। আপনি ভেবেছেন, এসব বলে আপনি পার পেয়ে যাবেন? মানুষ কি সব গাধা? দেশে কি আইন-কানুন বলে কিছু নেই ভেবেছেন? আপনি বলবেন আপনার জিনের আসর হয়েছে, ব্যস আদালত আপনাকে বেকসুর খালাস দিয়ে দেবে?”     

“জীন না, ডাক্তার সাহেব,” – সে একজন ক্রিমিনালের মতোই দায়সারা কণ্ঠে বললো – “আমি কি একবারও বলেছি, আমাকে জিনে আসর করেছে?”

“তাহলে কি আসর করেছে? ফেরেশতা?” – উত্তেজিত হয়ে বললাম আমি।

সে কাঁধ ঝাকালো – “ফেরেশতা, শয়তান, কোনোটাই আসর করেনি। আমাকে আসর করেছিল অন্য কোন কিছু।”

“আধুনিক কোন গাঁজাখুরি? এলিয়েন-ফেলিয়েনের গল্প ফাঁদছেন? শোনেন, আপনি একজন স্পষ্ট অপরাধী, কেয়ামত পর্যন্ত আপনি আমাকে গল্প শুনালেও আমি আপনাকে পাগলের সার্টিফিকেট দিচ্ছি না। আপনি এখন যেতে পারেন।”

সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে উঠে দাঁড়ালো। আমি ভাবলাম, বেঁচে গেছি। কিন্তু সে কি মনে করে আবার বসে পড়লো – “ডাক্তার সাহেব, আপনার চেম্বারে কোন আয়না আছে? আয়না থাকলে আপনাকে ব্যাপারটা বোঝাতে পারতাম।”

এ আবার কোন বুজরুকি? একবার ভাবলাম, পুলিশে কল দিবো নাকি? আমাদের ব্যাচমেট খাইরুল আছে পুলিশে। আমরা যখন সলিমুল্লাহ মেডিক্যালে থার্ড ইয়ারে, সে তখন লুকিয়ে বিকম পাশ করে ফেললো, তারপর বিসিএস দিয়ে পুলিশে জয়েন করল। এখন বড় পজিশনে আছে।

“আয়নার সামনে একবার দাঁড়াবো, তারপর চলে যাবো, আর আপনাকে ডিস্টার্ব করবো না।”

তার কণ্ঠস্বরে কোথাও একটা কাতরতা ছিল, ফলে আমি স্টিলের আলমারির দরজাতে যে বড় আয়না লাগানো আছে সেটা তাকে দেখিয়ে দিলাম। সে তখন চট করে উঠে গিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ালো – “এই দেখেন, ডাক্তার সাহেব। দেখেন, দেখেন, এই যে আমি হাত নাড়লাম, ঠিক আছে। কিন্তু ওইপাশে দেখেন, ওই হাতটা কিন্তু আগে নড়লো। ভালো করে খেয়াল না করলে বুঝতে পারবেন না। তার মানে আমার ছায়া আমাকে অনুসরণ করছে না, বরং উল্টো আমি আমার ছায়াকে অনুসরণ করছি।”

আমি আয়নার দিকে তাকিয়ে রইলাম, সে একবার ডান হাত মাথার ওপর ওঠাচ্ছে আর বলছে – “এই যে দেখেন, আগে প্রতিবিম্বের ডান হাতটা নড়লো, তারপর আমারটা নড়লো, সেকেন্ডের ভগ্নাংশের তফাৎ, কিন্তু ভালো যন্ত্রপাতি দিয়ে মাপলে আপনি ক্লিয়ার ধরতে পারবেন বিষয়টা।” অথচ আমার চোখে এসবের কিছুই ধরা পড়লো না।

“ডাক্তার সাহেব, আমাদের জীবনের নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে আর নেই। মনে হয়, কেয়ামতের আরেকটা গোপন লক্ষণ এটা, যেটা আমাদের নবীজি বলেছিলেন কিন্তু সাহাবীরা বুঝতে পারে নি বলে টুকে রাখে নি। আমার কোন সন্দেহ নেই, ভাই, আয়নার ভেতর আরেকটা দুনিয়া আছে, সেই দুনিয়াতে আমার মতো আরেকটা মিনহাজ আছে। আর আমি তাই করি, যা ওই মিনহাজ করে, বুঝলেন? এতদিন ভেবেছি, আমি আসল আর সে নকল। এখন মনে হচ্ছে, আমিই ছায়া, আর সেই আসল।”

আমার চোখে-মুখে কৌতুক উপচে পড়ছিলো, কেননা ততক্ষনে নিশ্চিত হয়েছি যে এক সত্যিকার উন্মাদের পাল্লাতেই পড়েছি আমি আজকে। আমার মনোভাব সে হয়তো আন্দাজ করতে পারলো – কিছুক্ষন আমার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে, তারপর একটা মনে হলো দীর্ঘশ্বাস ফেললো তারপর আস্তে করে ঘর থেকে বেরিয়ে চলে গেল। একবারও পেছনে ফিরে তাকালো না, বিদায়-টিদায়ও বললো না।

অযথাই আমার একটা ঘন্টা সময় নষ্ট হল – ভাবলাম। ক্লান্ত হাতে ব্যাগটা গুছিয়ে লাইট-ফ্যান অফ করে চেম্বার থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরে ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছে, রিক্সা চলতে শুরু করতেই মনটা শান্ত হয়ে এলো, যদিও স্ট্রিটলাইটের ঘোলাটে আলোগুলোকে তখনও খুব বিষন্ন লাগছিলো।

বাসায় ফিরতে মন চাইছিলো না। রিক্সাটাও চলছিল ধীর গতিতে। আমি নিশ্চিত, রেবাও আমার জন্য অপেক্ষা করে না, এমনকি হয়তো সে কিছুটা আতংকিতও থাকে এই ভেবে যে কখন কলিংবেলটা বেজে উঠবে আর আমি ঘরে ঢুকবো ক্লান্ত দেহ আর উদাসীন মন নিয়ে। কেন যে এমন হয়? অথচ তিন বছরের বেশি সময় ধরে প্রেম করে বিয়ে করেছিলাম রেবা আর আমি। তার বাবা-মা রাজি ছিল না, আমার বাবা-মাকে তো জানাইই নি।

এটা ঠিক, প্রবল প্রেম ক্রমশ ফিকে হয়ে আসে – কেউ কেউ সেটাকে প্রকৌশলীর দক্ষতা দিয়ে পারস্পরিক সমঝোতায় রূপান্তরিত করতে পারে, কেউ কেউ আবার পারে না। আমরা দু’জন যেমন পারিনি। সব সংসারেই এগুলো কম-বেশি হয়, কিন্তু অন্য সংসারগুলোতে যেটা নিয়মিত হয় না সেটা হলো পরকীয়া।

হ্যা, এখন আমার মাঝে মাঝেই আফসোস হয়, রেবাকে বিয়ে না করে কেন জারিনকে বিয়ে করি নি। ডক্টর জারিন আমার পাশের চেম্বারেই বসে, পেডিয়াট্রিশিয়ান সে, শুধু বাচ্চাদের দেখে। যখন চেম্বারে কোন রোগী থাকে না, জারিন আর আমি ঘন্টার পর ঘন্টা আলাপ করি। সে আলোচনা শুরু হয় চিকিৎসাশাস্ত্র নিয়ে, কিন্তু কোনোদিনই সেটা বন্দি থাকে না গাম্ভীর্যের গন্ডিতে – প্রায়ই জারিনের ছোটবেলার কোন কষ্টের কাহিনী শুনে আমার মন খারাপ হয়, প্রায়ই আমার ডার্ক হিউমারে সে হেসে ওঠে।

রেবার মতো চঞ্চল উড়ন্ত এক প্রজাপতি না ও, ডক্টর জারিন বরং দীঘির জলের মতো শান্ত ও নির্মল। আমার আজকাল আর প্রজাপতি ভালো লাগে না, আমার তৃষ্ণার্ত আত্মা চায় দীঘির জলে ডুবে ডুবে যেতে।

আমি জানি, এটা অন্যায়। ভালোলাগা কিংবা ভালোবাসার ওপর মানুষের হাত নেই, কিন্তু তার আচরণের ওপর নিশ্চয়ই তার হাত আছে। আমি কি পারি না জারিনের সাথে গল্প করা কমিয়ে দিতে? দিন দিন তার প্রতি আকর্ষণ বেড়ে চলেছে জেনেও কেন আমি নিজেকে প্রশ্রয় দিচ্ছি? আমার জানা নেই। হয়তো আমার নিজের ওপর নিজের সেরকম নিয়ন্ত্রণ নেই, যেরকমটা আমি মনে করি।

সেরাতে বাসায় ফেরার পর রেবা আমার সাথে অস্বাভাবিকরকম ভালো ব্যবহার করলো, ঘরে ঢুকতেই সে আমার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে নিলো, তারপর অনুরোধ করলো বাথরুম থেকে ফ্রেশ হয়ে আসতে – সে নাকি খাবার নিয়ে বসে আছে একসাথে খাবে বলে। আমি এধরণের অভ্যর্থনা পেয়ে অভ্যস্ত নই, ফলে ভয়ে একরকম কুঁকড়ে গেলাম।

খাবার টেবিলে সে জানালো কাল তার ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট আছে, আমি নিয়ে যেতে পারবো কিনা। আমি রাজি হলাম, কিন্তু তখন পর্যন্ত কেমন একটা ঘোরের মধ্যে ছিলাম। অর্ধেক ভাত খাবার পর আমার বমি বমি লাগতে শুরু করলো। সে রাতে রাত যত বাড়লো, অজানা এক আতঙ্ক আমাকে চেপে ধরতে লাগলো। সে আতঙ্ককে বর্ণনা করা আমার পক্ষে অসম্ভব, কেননা আর কোনোদিন এরকম আমার জীবনে হয় নি। একসময় আমার মনে হলো ভয়েই আমার মাথা ফেটে     চৌচির হয়ে যাবে।

মুখ থুবড়ে মেঝেতে পড়ে যাওয়ার আগেই বাথরুমে গিয়ে ঢুকলাম, উদ্দেশ্য মাথায় পানি ঢালা। কিন্তু আড়চোখে বেসিনের আয়নাটার দিকে তাকিয়ে দেখি, আয়নায় আমার ছবিটা যেন ঠিকভাবে আসছে না – কোথায় যেন একটা সমস্যা, যদিও সমস্যাটা ঠিক ধরতে পারছি না আমি।

এটা এমন একটা বিষয়, শব্দমালা সাজিয়ে-গুছিয়ে যেটা ব্যাখ্যা করা বেশ কঠিন ও জটিল। তবে আমার মূল সন্দেহটা হলো, আয়নায় আমার ছায়াটা আমাকে ঠিক অনুসরণ করছে না, একটু যেন আগে আগে সে রিএক্ট করছে, কিন্তু ঠিক আমার সাথে সাথে করছে না। ভিডিওতে জুড়ে দেয়া অডিওতে যখন সময়ের একটু হেরফের হয়ে যায়, তখন ঠোঁটের সাথে কথাগুলো যেমন মিলতে চায় না, দেখতে ভীষণ অস্বস্তি হয়, ভেতরে ভেতরে সেরকম একটা অনুভূতি হতে থাকে আমার। খুব অস্বস্তিকর অনুভূতি এটা, কিন্তু কাউকে আবার ঠিক বুঝিয়েও বলতে পারছি না।

সে রাতে ভীষণ মাথাব্যথা নিয়ে বিছানায় গেলাম, রাতে স্বপ্নে দেখলাম ঠিক আমার মতো দেখতে আরেকজন নগ্নদেহে রেবাকে জড়িয়ে ধরে আছে আর আমি চিৎকার করে ওকে বলতে চেষ্টা করছি যে ঐটা সত্যিকার আমি না, ঐটা আসলে মিথ্যাকার আমি।

পরদিন সকালে ফুটপাত ধরে হেটে যাচ্ছি, আড়চোখে খেয়াল রাখছি দেয়ালের ওপর আমার কালো ছায়াটার দিকে। কিন্তু কেন যেন মনে হচ্ছে বারবার, আমি যেন ছায়াটার হাঁটার গতির সাথে ঠিক তাল মেলাতে পারছি না – বার বার সে কিছুটা হলেও এগিয়ে থাকছে।

আমি নিশ্চিত হলাম, আমার এই স্বত্বাকে, আমার এই অস্তিত্বকে নিয়ন্ত্রণ করছে আমার ছায়া। আমি যে এতদিন ভেবে এসেছি যে কর্ম নির্ধারণ করে ফলাফল, তা আসলে ভুল ছিল। আসল সত্য তো এই যে, ফলাফলই নির্ধারণ করে কর্মকে।   

সবকিছুই পূর্ব নির্ধারিত, আর কেয়ামত আসলে সুদূর অতীতেরই এক ঘটনা। সব মিলিয়ে আজ সকাল নিজের ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলতে শুরু করেছি আমি।

Leave a comment