অপ্রেম

জেরিনরা ওদের পাশের বাসা ও ব্যালকনি ছেড়ে চলে যাবার পর ফারুক প্রায়ই ভীড়ের মধ্যে ওকে দেখতে পেতো – কখনো মার্কেটে, কখনো বইমেলার ভীড়ে অনেক সামনে, কখনো পাবলিক বাসে; যদিও শেষপর্যন্ত কখনো খুঁজে পায়নি ওকে সশরীরে। ব্যাপারটা এতোবার ঘটল যে, ফারুক ভয় পেয়ে গেল। কোন মানসিক বিশেষজ্ঞের কাছে যাবার মত মানসিক শক্তি ওর কখনোই ছিল না। সুতরাং শেষপর্যন্ত এক জ্যোতিষীর কাছে পাথর চাইতে গেলো সে।

জ্যোতিষী বলল – যেহেতু জেরিন ওকে খুব ভালোবাসতো, এটা অসম্ভব নয় যে তার আত্মা এখনো ঘুরে ফিরে বেড়ায় ফারুকের আশেপাশে।

মৃতদের আত্মার ব্যাপারে এ ধরণের কথা শুনেছি, কিন্তু জীবিতদের আত্মার ক্ষেত্রে এটা কোনদিন শুনি নি আমি – ফারুক বলেছিল।

আত্মা তো আত্মাই – তার আবার জীবিত কি, আর মৃত কি! – জ্যোতিষী হাসল।

আপনাকে খালেক সাহেবের ঘটনাটা তাহলে বলিই। উনি সারাজীবনের সঞ্চয় দিয়ে বানিয়েছিলেন তাঁর রামপুরার বাসাটা, খুব শখের ছিল ওটা তাঁর। তারপর শেষবয়সে ছেলেমেয়েদের পরামর্শে ওটা বিক্রী করে দিয়ে ধানমন্ডিতে একটা ফ্ল্যাটে উঠে যান উনি, কিন্তু তাঁর চলে যাবার বহুদিন পর পর্যন্তও তাঁকে ঐ পুরোনো বাড়িটার ছাদে হেটে বেড়াতে দেখা গেছে। দেখেছে পাড়া-প্রতিবেশীরাই যারা তাঁকে ভালো করে চিনতো – বিশেষ করে ভর দুপুরে আর শেষ বিকেলে। দেখা যেত, তিনি তাঁর কালো লাঠিটা হাতে নিয়ে ছাদের এপাশ থেকে ওপাশে হেটে বেড়াচ্ছেন – নীরবে। কিন্তু তিনি তো এখনো জীবিতই আছেন, মারা যাননি যে আত্মা হয়ে ছাদে ছাদে হেটে বেড়াবেন। এর কি ব্যাখ্যা, বলুন! ওহো, বাড়িটার জন্য ভালো দামই পেয়েছিলেন তাঁরা – অথচ ভূতুড়ে বাড়ি বলে নাম হয়ে যায় ঐ বাড়িটার। কিন্তু আপনিই বলুন, জীবিত মানুষের কি ভূত হয়? হা, হা, হা …

তারপর থেকে অনেক রাতে, বিকেলে এবং দুপুরে ফারুক চেয়ে থেকেছে একটানা জেরিনদের ঐ বারান্দাটার দিকে, মাঝে মাঝে ছাদেও; কিন্তু সৌভাগ্যক্রমেই হোক আর দুর্ভাগ্যক্রমেই হোক – জেরিনের আত্মা কিংবা ভূত কোনটারই দেখা পায় নি সে আর।

তারপর একদিন জেরিনের মায়ের সাথে তার দেখা হলো এক শপিং মলে। মোটা, পান চিবোচ্ছেন, এবং যথারীতি রুচিহীন – কিন্তু জেরিনের সাথে তার চেহারার মিল তখনো অত্যন্ত তীব্রভাবে বোঝা যাচ্ছিল। জীবন এরকমই একঘেয়ে – সে নিজেকে সান্ত্বনা দেয় – জেরিনও সময়ের আবর্তনে পরিণত হবে এমনই একটি আশ্চর্য বোধহীনতায়। শাকিলকে যখন ঘটনাটা বলল, হাসতে হাসতেই ও অস্থির – তার মতে, ওটা আসলে অন্য কেউ ছিলো না বরং ওটাই ছিল জেরিনের ভূত।

তখন থেকে ফারুক বেশি বেশি সময় কাটাতো তিনতলার সিড়িকোঠায় বসে থেকে আর রোদের নীরব দুপুরে দূরের ছাদগুলোতে কাপড়গুলোর রোদে উড়ে উড়ে শুকানো দেখে।

এভাবেই তার দিন কাটছিলো – অনেকদিন। তারপর একদিন খুব বৃষ্টি নামে।

ফারুক ছাদে উঠে আসে, কিন্তু বৃষ্টিতে গা ভেজায় না। সে সিড়িকোঠায় বসে থাকে বৃষ্টি দেখার জন্য। একসময় সামনের গলিটা জলে ভরে ওঠে। একসময় বৃষ্টির ঝাপটা ওর গায়ে এসে লাগে। ফারুক একটু সরে বসে।

ঠিক তখন মেয়েটা বেরিয়ে আসে। জেরিনদের ছাদের দরোজা খুলে সে সন্তর্পনে পা রাখে বৃষ্টিতে, তারপর তামাটে মুখ তুলে তাকায় আকাশের দিকে। আবার বৃষ্টির ঝাপটা গায়ে এসে লাগে, অন্ধকারে স্থির বসে থাকা ফারুকের শার্টের কলারটা পানিতে ভিজে যায়। তার হঠাৎ মনে হয় সে স্বপ্ন দেখছে, হয়তো মনে মনে প্রার্থণাও করে ঘুমটা ভেংগে না যাবার জন্য।

মেয়েটা হাত দু’টো সামনে বাড়িয়ে দেয়, পৃথিবীর সমস্ত বৃষ্টি হাত দু’টোকে স্পর্শ করার জন্য ছুটে চলে। আরামদায়ক এক আলস্যে সে চোখ বুঁজে ফেলে, তারপর একসময় ঘুরে ঘুরে নাচতে শুরু করে – এলোমেলো। ভিজে জবজবে হয়ে থাকা তার কালো স্কার্ট একবার এদিকে আরেকবার ওদিকে জলের বিন্দু ছড়ায়, অসংখ্য আলোকবিন্দু ছুটে আসে সিড়িঘরের বিস্মিত ঐ চোখগুলোর দিকে – ফারুক নতুন শহরের অনাবিষ্কৃত নির্জন পথে চলার অনুভূতি নিয়ে বসে থাকে অদ্ভুত এক অন্ধকারে। বৃষ্টি আরো একটা ঝাপটা দিয়ে যায় পুরনো সিড়িকোঠায়।

এই মেয়েটি জেরিন নয়, জেরিনের ভূতও নয়। ও শুধু অন্য একটি মেয়ে। অদ্ভুত একটা অনুভূতি পেয়ে বসে ফারুককে। জেরিনের ভূত নয় – এমন একটি মেয়ে যখন জেরিনের ছাদটাকে দখল করে নিতে পেরেছে, তাহলে সামনের কোন একদিন অন্য কোন জ্যান্ত নারীও এই মেয়েটির বারান্দাটিকে দখল করে নিতে পারবে।

কিছুই নিশ্চিত নয়, কোনকিছুই অমোঘ নয় এবং কোন সম্পর্কই মলিনতার ঊর্ধ্বে নয়।

ফারুকের মেয়েটাকে ভালো লাগতে শুরু করে, কিন্তু এই ভালোলাগাটাই আবার অর্থহীন করে তোলে তার অতীতের সমস্ত ভালোলাগাগুলোকে। দু’জনের প্রতি দুর্বলতা উভয়ের অপ্রয়োজনীয়তাকেই মূলত: স্পষ্ট করে তোলে।

ফারুক আকাশের দিকে তাকায়। ওর কেন যেন মনে হয়, এই বৃষ্টিটা অনেকক্ষণ ধরে চলবে।

One thought on “অপ্রেম

Leave a comment