জটিল অনেক সংজ্ঞা থাকলেও এই লেখার জন্য – “যা আমরা যাপন করি তাই জীবন”। যখন ঘুমাই, তখন যাপন করি স্বপ্ন। যখন জেগে থাকি তখন যাপন করি চারপাশের জগত। কিন্তু কি সেই জগত? শরীরের চারপাশের জগতটাই কি একমাত্র জগত যা আমরা জেগে থাকা অবস্থায় যাপন করি? না। একেবারেই না।
অবসরে কি করবো বুঝে উঠতে পারছিনা। সব পরামর্শই বিরক্তিকর লাগছে। হঠাৎ করে টেলিভিশনটা কেন যেন একাই চালু হয়ে গেল। কোন একটা গাড়ির প্রতিযোগিতার ওপর একটা প্রামান্য চিত্র দেখাচ্ছে। গাড়ির রেস নিয়ে আমার আগ্রহ প্রায় শুন্যের কোঠায়। তারপরও চোখের সামনে চলতে থাকায় তাকিয়ে দেখতে থাকলাম, একটু পর মনযোগ দিয়ে শুনতেও লাগলাম। দেখতে দেখতে প্রায় ১৫/২০ মিনিট চলে গেলো। একই অবস্থায় বসে সময়টা গেল, কাজ করল শুধু আমার মগজ আর মন। আনন্দ তেমন না পেলেও বোরিং ভাবটাও ছিল না। এটাই তো খুব সাধারণ একটা জীবন যাপনের উদাহরণ হতে পারে। কিন্তু মুশকিল হল, এ ঘটনার মূল অংশ শরীরী জগতে নয়। অর্থাৎ টেলিভিশনের ভেতরের জগতটা শরীরী নয়, অশরীরী। ফলে এক্ষেত্রে জীবনটাকে যাপন করেছে মূলত আমার অশরীর অর্থাৎ মন বা সে জাতীয় কিছু।
সুতরাং, শুধু ঘুম নয়, জেগে থাকা সময়েও জীবন যাপন আমাদের অশরীরী অংশের মাধ্যমে হতে পারে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, টিভি বা সিনেমা দেখা, কম্পিউটারে সময় পার করা, সোশ্যাল মিডিয়া কিম্বা গেমিং এ সক্রিয় থাকা, এ সবই একই জাতীয় অশরীরী জীবন যাপনের উদাহরণ। এটা সত্যি যে শরীরটা জীবিত আছে বলেই মন বা অশরীরী এসব উপভোগ করছে; কিন্তু সত্যি কি তাই? শরীরটা অকেজো হলে যে অশরীরী হারিয়ে যায়, এমনটা তো কোথাও পাওয়া যায় না, বরং উলটোটাই বেশি পরিচিত তথ্য। যা হোক এ লেখায় সে আলোচনায় যেতে চাইনা।
যে চিন্তা থেকে এ লেখা শুরু করেছি তা হল, যুগ আধুনিক হবার সাথে সাথে আমাদের প্রকৃষ্ট মানের শারীরবৃত্তীয় জীবন যাপন ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। হয়তো এরকম একটা সময় খুব কাছেই যখন শরীরটা শুধুই মনের বাক্স হিসাবে টিকে থাকলেই চলবে, শরীরের আর বিশেষ কোন সরাসরি ব্যবহার থাকবে না। কেমন হবে এরকম হলে, ভালো, না খারাপ? একটা প্রতীকী উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা বিশ্লেষণ করা যাক।
মনে করুন, মানুষের শরীরটা হল হাত-মোজা, অশরীর (মন ইত্যাদি) হল হাত। একটা নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত হাতটাকে হাত মোজার ভেতরেই থাকতে হবে। হাতমোজা পরা অবস্থায় ওই হাত দিয়ে ঠিক মত কাজ করার জন্য হাতের আঙ্গুল গুলোকে হাতমোজার আঙ্গুলগুলোতে ঢুকাতে হবে। ফলে, হাত যা কিছুই করবে, হাতমোজাকে সঠিক ভাবে ব্যবহারের মধ্য দিয়েই করবে। ধরুন, কোন একটা হাত তার মোজাকে ঠিক মত ব্যবহার না করেই করে কাজ করার চেষ্টা করছে, অথচ সে মোজার ভেতরেই; ধুরুন সে তার অঙ্গুল গুলোকে মোজার আঙ্গুলের মধ্যে দিয়ে ব্যবহার না করে অন্য যে কোন উপায়ে ব্যবহার করছে ! বুঝতেই পারছেন, সে ক্ষেত্রে হাত তার কর্মক্ষমতাকে কমিয়ে ফেলছে – এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই।
ঠিক তেমনি যতক্ষণ আমরা শরীরী জীবনে বেঁচে আছি ততখন আমাদের অশরীরীর সর্বোৎকৃষ্ট ব্যবহার কেবল মাত্র শরীরের মধ্য দিয়েই হয়। শরীরকে স্বাভাবিক পরিমান ব্যবহার ছাড়াই মন যে আনন্দ পায় তা কখনই পুরনাঙ্গ নয়। বরং এতে আমাদের ভেতরে ক্লান্তি আর সমস্যা বাড়তে থাকে যা বিশ্রামে কমে না, বরং বাড়ে। একটা ছোট্ট উদাহরণ দিলে আরও ভালো করে বুঝবেন। যখন কেউ মাদকের নেশায় আসক্ত থাকে, তখন প্রতিবারের নেশা তার শরীরে এক ধরণের হরমোনের ক্ষরণ ঘটায়, এটাই তার মাদকের কাছে ফিরে যাবার যে অদম্য ভালো লাগা তার মূল ব্যাখ্যা। একই হরমোনের ক্ষরণ ঘটে যখন কেউ শরীর চর্চা করে – ফলে একই ধরণের ভালো লাগা কাজ করে। দুটো ভালো লাগাই এখানে মূলত মন কেন্দ্রিক, কোন সন্দেহ নেই। অথচ প্রথমটি কোন রকমেই দ্বিতীয়টির সমতুল্য নয় ।
মাঝে মাঝে সমস্যায় ভরা শরীরী জগতটাকে অগ্রাহ্য করে অশরীরী বা ভারচুয়াল জগতে গা ভাসিয়ে দিতে কার না ভালো লাগে; এটা বিশ্রাম হিসাবেও ভালো। তাই অশরীরী জগত বর্জনের পক্ষে আমি মোটেও নই। শুধু এটুকু বলতে চাই, ভারসাম্য রাখুন, শরীরী আর অশরীরী – দুটোতেই বিরাম দিন, আর নিশ্চিত করুন আপনার শরীরী জীবন যাপনের পর্যাপ্ততা। তাহলেই পাবেন শারীরিক, মানসিক, সামাজিক এবং আধ্যাত্মিক অর্জন – অন্তত যতদিন এই শরীরী জগতে বেঁচে আছেন।
