সক্রেটিস

১.

এথেন্স শহরের এক রোদেলা দুপুর। রুটি বানাতে যেয়ে জগৎ সংসারের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে পড়লেন সিনোরা জেনথিপি। তার সিনোর ছিলেন উঠোনে বসা, বিষন্নতার প্রথম ঝড়টা ভদ্রলোকের ওপর দিয়েই বয়ে গেল। মুখ বুজে বেশ কিছুক্ষন স্ত্রীর বাক্যবাণ হজম করার পর অপরাহ্ণ ভ্রমণে বের হওয়াই সমীচীন মনে করলেন সক্রেটিস।

গ্রিক এই দার্শনিক হাটতে শুরু করলেন লাইকাবেটোস পর্বতের দিকে। এথেন্সের খুব কাছেই এই পাহাড়। কিছুক্ষন পথ চলার পর গ্লোকেনের সাথে দেখা হতেই সক্রেটিস খুশি হয়ে উঠলেন, ক্ষনিকের কথোপকথন শেষ করলেন যথারীতি উপদেশের মাধ্যমে – ‘যদি চাও, বিয়েটা করে ফেলতে পারো, বৎস্য। যদি ভালো স্ত্রী ভাগ্যে থাকে, তাহলে তুমি সুখী হবে। আর যদি মন্দ স্ত্রী পড়ে তোমার কপালে, তাহলে অন্তত ভালো দার্শনিক হতে পারবে। এই পৃথিবীতে তোমার আসলে হারানোর কিছুই নেই।’

গ্লোকেনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আরো কিছুক্ষন হাঁটার পর পাহাড়ের পাদদেশে পৌঁছে গেলেন সক্রেটিস। ছায়াঘেরা সে জায়গাটায় বিশ্রাম নেয়ার জন্য বসলেন, কিন্তু কিছুক্ষনের মধ্যেই হারিয়ে গেলেন চিন্তার রাজ্যে। কতটা সময় এভাবে চলে গেছে, তিনি সেটা জানেন না। ধ্যান ভেঙে যখন চোখ খুললেন, দেখলেন সূর্য হেলে পড়েছে পশ্চিমাকাশে, সবুজ বৃক্ষরাজির ওপর পাহাড়ের ছায়া দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। তিনি বাড়িতে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেন। আশা করা যায়, ইতোমধ্যে সিনোরার মস্তিষ্ক শীতল হয়েছে, অন্যদিকে সদ্য বানানো রুটিগুলো হয়েছে উত্তপ্ত।

কিন্তু ফেরার জন্য উঠে দাঁড়াতেই কাছাকাছি একটা গুহায় তার দৃষ্টি আটকে গেল। লাইকাবেটোস পর্বতে ছোট ছোট অনেকগুলো গুহাই রয়েছে, কিন্তু সেগুলোর কোনোটাই বসবাসের যোগ্য না। অথচ এই গুহাটির সামনে কেউ আগুন জ্বালিয়ে রেখেছে। কৌতূহলের কাছে দ্বিধা হার মানলো বলে সক্রেটিস সেই গুহাটির দিকে হাটতে শুরু করলেন। উঁচু-নিচু বেলেপাথর ডিঙিয়ে অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই তিনি পৌঁছে গেলেন গুহামুখে।

২.

গুহার বাইরে বেশ কয়েকটি মশাল সাজিয়ে আগুন জ্বালানো হয়েছে। ভেতরে উঁকি দিয়ে দেখলেন, কিছু লোকের মাথা দেখা যাচ্ছে। মোট সাতজন লোককে গুহার ভেতরের দিকে মুখ করে বেঁধে রাখা হয়েছে। শেকল দিয়ে এমনভাবে ওদের আটকে রাখা হয়েছে যে ওরা ঘাড় পর্যন্ত নাড়াতে পারছে না। আগুনের সামনে দিয়ে যা কিছু হেটে যায়, তার ছায়া পড়ে গুহার পেছনের দেয়ালে, আর মুখ একদিকে আটকে থাকার কারণে ওরা অন্ধকার গুহায় ছায়াগুলোর খেলা ছাড়া আর কিছুই দেখতে পায় না। যেহেতু ওরা বাস্তব কোন জিনিসকে কোনোদিনই দেখেনি, সেজন্য ছায়ার সেই খেলাকেই ওরা মনে করে আসল জগৎ।

আদর্শবাদী এই দার্শনিক কিছুতেই মেনে নিতে পারলেন না অজ্ঞতার কাছে এই সাতজন বন্দীর অসহায় আত্মসমর্পনকে। ওদের সামনে যাওয়ার কোন পথ খুঁজে না পেয়ে পেছন থেকেই কিছু সংলাপ শুরু করার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি।

‘ওহে বন্দী লোক সকল।’
‘কোন উন্মাদ আমাদের বন্দী বলে ডাকছে আজ। আমরা তো স্বাধীন, যেমন স্বাধীন আমাদের পর্যবেক্ষণ করার ক্ষমতা।’ – কিছুক্ষন নীরবতার পর ওদের একজন বলে উঠলো।

‘কিন্তু যে পৃথিবী তোমরা পর্যবেক্ষণ করছো, সেটা দ্বিমাত্রিক কিছু ছায়া মাত্র। আসল পৃথিবী তো ত্রিমাত্রিক।’
‘দুই মাত্রার পৃথিবীই সত্য। আমরা তাই বিশ্বাস করি, যা আমরা পর্যবেক্ষণ করতে পারি।’ – ওদের ভেতর আরেকজন উত্তর দিল।

‘মাত্রা তিনটি – দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা। এ নিয়েই আসল পৃথিবী।’
‘যা আমরা দেখতে পারি না, তা সত্য হতে পারে না।’ – তৃতীয়জন উপসংহার টানলো।

সক্রেটিস দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি বুঝতে শুরু করলেন, বন্দীদশা থেকে ওদের মুক্ত না করা পর্যন্ত ওদের সাথে যে কোন সংলাপ অর্থহীন। ওই সাতজন অসহায় বন্দীর জন্য তার শোককে বুকে চেপে রেখে তিনি গুহা থেকে বের হয়ে এলেন।

কিন্তু গুহা থেকে বের হয়ে সক্রেটিস যে দেখলেন, তার জন্য তিনি একেবারেই প্রস্তুত ছিলেন না। তিনি দেখলেন, কেমন করে যেন তার চারদিকের দৃশ্যপট বদলে গেছে। কোথাও কোন আলো নেই। সন্ধ্যার সামান্য আলোও কোথাও দেখা যাচ্ছে না। ফেরার পথের দিকে তাকালেন, এথেন্সের দিক থেকেও কোন আলো আসছে না।

সক্রেটিস ভাবলেন – এ হতেই পারে না, কিন্তু আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলেন একটা তারাও নেই সেই নিকষ কালো অন্ধকারে। পেছনে তাকিয়ে দেখলেন, ততক্ষনে সেই রহস্যময় গুহাটিও উধাও হয়ে গেছে কেমন করে যেন।

৩.

আতঙ্কে চিৎকার করে উঠলেন সক্রেটিস – ‘কে আছো? বাঁচাও?’
‘স্বাগতম।’ – কেউ কথা বলছে শূণ্যের ভেতর থেকে।
‘কে তুমি?’
‘আমি দেবদূত।’ – একটা যুগল কণ্ঠ শোনা যাচ্ছিল, অনেকটা ঝি ঝি পোকার শব্দের মতো।

‘আমি কোথায়?’
‘তোমার ধ্যান তোমার চেতনাকে নিয়ে এসেছে চতুর্থ আকাশে।’
‘চতুর্থ আকাশ কি?’
‘যে আকাশ থেকে চারটি মাত্রা অনুভব করা যায়।’

সক্রেটিস কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন – ‘দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা ছাড়াও মাত্রা আছে?’
‘চতুর্থ মাত্রাটি সময়।’ – ঝি ঝি পোকা জানিয়ে দিল।

সক্রেটিসের তখন মনে হল – এসব যদি সত্যি হয়, তাহলে তিনি নিজেও এক গুহায় বন্দী – বৃহত্তর কোন গুহায়।
‘এখন আমি আর বুঝতে পারছি না আমি কোন জগৎকে বিশ্বাস করবো।’ – বললেন তিনি।
‘জগৎ একটাই, একেক ধরণের অস্তিত্ব একেক মাত্রা পর্যন্ত অনুভব করতে পারে। মানুষের বোধ তিনটি মাত্রায় সীমাবদ্ধ, আবার আমরা একসাথে চারটি মাত্রাকে অনুভব করতে পারি।’

সক্রেটিস এবার সোজা হয়ে দাঁড়ালেন – সময় যদি শুধু আলাদা একটি মাত্রা হয়, তাহলে তিনি নিশ্চয়ই ভ্রমণ করতে পারবেন অতীত থেকে ভবিষ্যতে, ঠিক যেভাবে কিছুক্ষন আগে তিনিএথেন্স থেকে চলে এসেছিলেন লাইকাবেটোস পর্যন্ত। সক্রেটিস একজন দার্শনিক, তাকে তার প্রকল্পের শেষ পর্যন্ত নিরীক্ষণ করতেই হবে।

আলো দু’টি উধাও হয়ে গেল, আর তার চোখের সামনে ভেসে উঠল দৃশ্যপট – লোকজন একটা লাশ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। মুখটা খুব চেনা, ওটা সক্রেটিস প্রায় প্রতিদিনই আয়নায় দেখেছেন।

সক্রেটিস অতীতের কথা ভাবলেন, তখন পেছনের দিকে ঘটতে শুরু করল ঘটনাটা। লাশ নিয়ে ওরা পেছনে হাটতে লাগল, কয়েকজন প্রহরীর সামনে বসে তিনি, তার মুখ থেকে বের হয়ে পেয়ালায় ফিরে যাচ্ছে হেমলক বিষ।

সক্রেটিস তখন হঠাৎ করে বুঝতে পারলেন – অতীত আর ভবিষ্যৎ আসলে পর পর আঁকা কতগুলো ছবির মত, একটার পর একটা সাজানো আছে আর যা ঘটার তা ঘটবেই। অতীত হোক আর ভবিষ্যৎ হোক, জন্ম হোক আর মৃত্যুই হোক – সব আসলে ঘটে গেছে।

ভাগ্য মানেই পূর্বনির্ধারিত, এবং মানুষ যথারীতি মূল্যহীন।

সক্রেটিস বুঝতে পারলেন – হেমলক পানে তার মৃত্যু আদতে ভবিষ্যতের কোন ঘটনাই নয়, চতুর্মাত্রিক এক জগতের দৃষ্টিকোণ থেকে সে মৃত্যু আসলে ঘটে গেছে।

এসবকিছু যখন তিনি ভাবছিলেন, তখন হঠাৎ করেই আবার তার চারিদিকে সবকিছু বদলে যেতে শুরু করল – দৃশ্যপটে ভেসে উঠতে শুরু করল লাইকাবেটোস পর্বতের ঢাল আর দূরে এথেন্স শহর থেকে ভেসে আসা আলোর রেখা। পেছন ফিরে সক্রেটিস কোন গুহা কিংবা ওর সামনে কোন মশালের আলো দেখতে পেলেন না।

সক্রেটিস বুঝতে পারলেন – তার জন্য সিনেট যে বিচারের আয়োজন করেছে, সে বিচারে জুরি তাকে দোষী সাব্যস্ত করবে। কিন্তু তিনি আশ্চর্য হলেন এটা দেখে যে – সবকিছুর পরও কেন যেন নিজের মনে তীব্র এক ধরণের শান্তি অনুভব করছেন তিনি। জানার চেষ্টা ছেড়ে দেয়ার মধ্যে যে একরকম প্রশান্তি আছে তা আগে কোনদিন তার অনুভব করা হয়ে ওঠে নি।

Leave a comment