পবিত্র শবে-বরাতের পরদিন সকালে একটু দেরি করে ঘুম থেকে উঠে দাঁত ব্রাশ করতে বাথরুমে ঢুকে দেখি, আয়নায় আমার কোন প্রতিবিম্ব দেখা যাচ্ছে না। আয়নাতে আমার সবুজ গেঞ্জিটা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, কিন্তু দেহের জায়গাটা শূন্য – যেন কোন অদ্ভুত বেলুন ভেতর থেকে অনেক কষ্ট করে ধরে রেখেছে পরিধানের ঐ বস্ত্র।
একরাশ বিরক্তি নিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে সকালের আলোর বিপরীতে দেখলাম, শরীরের আশে-পাশে কোথাও আমার ছায়াটা দেখা যাচ্ছে না।
বিরক্তি আরো বেড়ে গেলো। কি চাইলাম সারারাত ধরে, আর কি পেলাম!
শবে-বরাত, তাই আমরা সবাই মসজিদে ছিলাম সারারাত। সারামাস ঘরে জ্বালানি তেলের সংকট এই শহরবাসীর জন্য অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে এসেছে, তাই ইমাম সাহেব হাত তুলে মুনাজাত করেছে যাতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান-ইস্রায়েল যুদ্ধ যেন তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে মোর না নেয়। ব্যক্তিগতভাবে খোদার কাছে কেউ চেয়েছে চাকরি। কেউ চেয়েছে মূল্যস্ফীতি কমুক। কেউ বলেছে দেশে রাজনীতির হানাহানি বন্ধ হোক। আমার বন্ধু রাশেদ চেয়েছে বাংলাদেশ যেন অস্ট্রেলিয়ার সাথে টেস্ট সিরিজটা জিতে।
আমি তো এসব কিছু চাই নি।
আমি চেয়েছিলাম শুধুই হেদায়েত। সারারাত এবাদত করে এই কি তবে আমার বিনিময়!
যাহোক, এসব নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করার তেমন সময় আমার হাতে ছিল না। এগারোটা বেজে গেছে বলে কোনোমতে রেডি হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে এলাম। বাইরে তখন কেমন যেন ঘোলাটে একটা রোদ।
অফিসে ঢোকার মুখেই আশরাফ আলীর ডেস্ক, দেখি উনি মনমরা হয়ে বসে আছেন। সালাম দিয়ে ঘটনা জিজ্ঞেস করতেই মুখ তেতো করে বললেন – “আর বলবেন না, সকাল থেকে আয়নায় নিজেকে দেখতে পাচ্ছি না।”
“ও, এই ঘটনা! কিন্তু এটাতো তেমন বড় কোন সমস্যা না।”
“বড় কোন সমস্যা না মানে?” – আশরাফ সাহেব প্রায় আঁতকে উঠলেন – “আয়না কাজ না করলে চুল আচড়াবো কি করে, সেভ করবো কিভাবে?”
“তা অবশ্য ঠিক।” – একমত না হয়ে পারলাম না আমি।
রকিব ভাই আমাদের মালিকপক্ষের লোক। সারাক্ষন কথা বলেন – বড় বড় কথা। ডেস্কে বসতে না বসতেই আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি ঠিক মনে করতে পারলাম না, ঠিক কোন ফাইলটা নিয়ে গতকাল তিনি নানান অভিযোগ করেছিলেন। কয়েক মুহূর্ত ইতস্তত করে একটা ডাইরি হাতে তার চেম্বারে চলে গেলাম। আমাকে দেখে তিনি বসতে বললেন।
“দাঁড়িয়ে আছো কেন? আরে, বসো।” – রকিবুল হাসানের সাথে দাঁড়িয়ে কথা বলাটা আমাদের অলিখিত নিয়ম, তাই বসতে বলাতে আমি বেশ অস্বস্তিতে ভুগতে শুরু করলাম। বলেই তিনি জানলার দিকে চলে গেলেন, আমি বসলাম কি বসিনি সেটার তোয়াক্কা না করে বলে উঠলেন – “মুশফিক, তোমার আয়নাটা কি ঠিকমতো কাজ করছে? সকালে খেয়াল করে দেখেছিলে?” বুঝলাম তিনিও ভুক্তভোগীদের একজন।
রাত আটটা নাগাদ সারা শহরে খবর হয়ে গেল, শবে বরাতের ফজর থেকে বহু মানুষ আয়নায় তার প্রতিচ্ছবি দেখতে পাচ্ছে না। সংবাদকর্মীরা বহু লোকের সাক্ষাৎকার নিলো, লাইভ টেলিভিশনে দেখানো হলো – দামি বার্গারের দোকানের কাঁচে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে থাকা দুজনের মধ্যে একজনের প্রতিবিম্বে মাথা আছে, আরেকজনেরটাতে মাথা দেখা যাচ্ছে না, শুধু জামা-কাপড়। এনটিভি বাংলার রিপোর্টার লাইভ করতে গিয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখতে না পেয়ে লজ্জায় লাল হলো।
প্রায় এক সপ্তাহ ধরে এ নিয়ে সংবাদ-মাধ্যম আর মিডিয়া-টিভিতে বেশ মাতামাতি হলো। যাদের জিহবার ধার বেশি, তাদের কেউ কেউ টক-শোতে এর জন্য সরকারকে দায়ী করলেন। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের ডিজি আফম রেজাউল করিম সাহেব অবশ্য দ্বিমত প্রকাশ করে বললেন, তার বিশ্বাস এর সাথে পার্শ্ববর্তী কোন একটা দেশের ষড়যন্ত্র থাকতে পারে, গোয়েন্দা বিভাগ যেটা বর্তমানে তলিয়ে দেখছে। তবে অন্য সব সংবাদের মতোই এই খবরেরও জোয়ার কমে এলো, তারপর একসময় হারিয়ে গেলো আবার চাগিয়ে ওঠা মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের দামামা আর অন্যান্য সড়ক দুর্ঘটনার আড়ালে।
আমি যখন প্রায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি এই ছায়াহীন জীবনে, তখন সোশ্যাল মিডিয়াতে একটা কথা চোখে পড়লো। আটরশির সুফী সাধক মাওলানা জুবায়ের চিশতী নাকি বলেছেন, এই রোগটা তাদেরই হচ্ছে যাদের মধ্যে ঈমান নেই। তার মুরিদরা নির্ভরযোগ্য সূত্রে খবর পেয়েছে যে ঢাকা শহরে এই রোগের প্রাদুর্ভাব সবচেয়ে বেশি। আর কে না জানে, রাজধানী শহরগুলোতে নাস্তিক আর সন্দেহবাদীদের সংখ্যা সাধারণত বেশি থাকে। দৈনিক ভোরের কাগজের মূল প্রতিনিধিকে ডেকে তিনি দাবি করলেন তার মুরিদদের মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যা এখনো খুবই কম।।
স্বাভাবিকভাবেই এই খবর প্রকাশের পর হাজারে হাজার মানুষ জুবায়ের সাহেবের বায়আত নেয়ার জন্য আটরশিতে ভিড় করতে লাগলো। এদের মধ্যে পূর্ত-সচিব মোজাম্মেল সাহেব আর কর্নেল (অব:) আনোয়ার সাদাৎকে আমি ছবি থেকে চিনতে পারলাম।
আটরশির পীরজাদার ব্যাখ্যাটা কেমন করে যেন আমার মাথায় গেথে গেলো। এমনভাবে গেথে গেলো যে আমি শেষরাতের দিকে দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম।
যেমন, আটরশির মাহফিলের দুইদিন যেতে না যেতেই ভোররাতে ফজরের আজানের ঠিক আগে দিয়ে স্বপ্নে দেখলাম, আয়নার ভেতর আমার প্রতিচ্ছবিটা ফিরে এসেছে, কিন্তু ফিরে এলেও সে যেন ঠিক আর আগের মতো নেই। আগে আমি ডানদিকে নড়লে সেও ডানদিকে নড়তো, ঠিক যেভাবে ফেরেশতারা মেনে চলে ঈশ্বরের নির্দেশ। কিন্তু এখন সে যেন আয়নার ফ্রেমটার ভেতরের জায়গাটায় অন্তত একধরণের ইচ্ছার স্বাধীনতা উপভোগ করতে শুরু করেছে, আর সেটা পাওয়ার সাথে সাথে আমার সাথে বেয়াদবি শুরু করে দিয়েছে। তারই একটা লক্ষণ দেখিয়ে সে বলে উঠলো – “আপনি কে?”
“আমি কে মানে?” – স্বপ্নের ভেতরই রেগে-মেগে বললাম আমি – “আমি তোর উৎস, তোর স্রষ্টা।”
“স্রষ্টা? সেটা আবার কি? আমি তো সবসময়ই এখানে ছিলাম।”
“‘সবসময়ই এখানে ছিলাম’ মানে? আমি আয়নার সামনে দাঁড়ানোর আগে তুই কোথায় ছিলি, হারামজাদা?”
“আপনি কিন্তু আমাকে অপমান করছেন। আমাকে ‘আপনি’ করে বলবেন প্লিজ।”
এই পর্যায়ে আমার ঘুমটা ভেঙে গেলো। বাইরে তখন ফজরের আজান শুরু হয়েছে, এক মসজিদে আজান শেষ হয় তো আরেকটাতে শুরু হয়।
হঠাৎ কোন স্বপ্ন কোনোদিনই আমাকে বিচলিত করে না, কিন্তু এই স্বপ্ন আমাকে করলো। হয়তো এই কারণেই করলো যে পরপর তিনদিন আমি এই একই স্বপ্ন দেখলাম। দ্বিতীয় রাতে তার বকবকানি একটু বেশিই মনে হলো, রীতিমতো বিরক্ত করে ছাড়লো। এমনকি বলে বসলো – “আমার তো ধারণা, আপনি আসলে আমার উর্বর মনের অদ্ভুত এক আবিষ্কার, বাস্তবে আসলে আপনার কোন অস্তিত্বই নেই।”
“আসলে তো আমারই শুধু অস্তিত্ব আছে, তোরই আসলে কোন অস্তিত্ব নেই।” – অনেক কষ্টে নিজেকে সংযত রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বললাম আমি – “হেদায়েত থাকলে এসব বলতে পারতি না।”
তৃতীয় রাতে আর সহ্য করতে পারলাম না, হাতের কাছের ফুলদানিতে ছুড়ে মারলাম স্বপ্নের ওই আয়নার দিকে, আর এতে আয়নাটা খান খান হয়ে ভেঙে গেলো। তখন আবার আয়নার ভেতর থেকে – কিংবা ওপাশ থেকে, যেটাই হোক না কেন – সে বলে উঠলো – “তাই বলে আমাকে এভাবে মেরে ফেললেন, জনাব?”
এই পর্যায়ে আমার ঘুম ভেঙে যায়। উঠে বসে দেখি ঘরটা অন্ধকার। কয়েক মুহূর্ত লাগলো মনে করতে, আমি আয়নার ভেতরে আছি নাকি বাইরে। তবে আশ্চর্য হলেও সত্য, স্বপ্নের ভেতর আয়নাটা ভেঙে দেয়ার পর থেকে স্বপ্নের ওই সিলসিলা ভেঙে গেল। কিন্তু ধারাবাহিক ওই স্বপ্ন থেকে মুক্তি পেলেও দুশ্চিন্তা থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারলাম না আমি। বরং রহস্য আমার মনে আরো ঘনীভূত হলো বুধবার সন্ধ্যায় মাইশার সাথে কথা বলার পর।
মাইশা আলমের সাথে সপ্তাহে অন্তত একবার দেখা করি আমি, বেইলি রোডে চটপটি ও ফুচকা খেয়ে একসাথে একটু হাটাহাটি করি আর ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সাজাই। এই কয়দিন আমার ঘটনাটা চেপে রেখেছিলাম ওর কাছ থেকে। ভীষণ ভয় হচ্ছিলো, ছায়াহীন এক কায়ার সাথে মেয়েটা নিজের জীবনকে বাঁধতে নাও চাইতে পারে। আর এটা কে না জানে, মেয়েরা অনাগত সন্তানের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতন, আর ছায়াহীন ব্যক্তির ঔরষজাত সন্তানও ছায়াহীন হওয়ার একটা ঝুঁকি থেকে যায়। কিন্তু অনেক ভেবে-চিন্তে বৃষ্টির গন্ধভেজা সেই সন্ধ্যায় তাকে বলেই দিলাম আমার অসুখটার কথা, নিজেকে অনেকটা নির্ভর মনে হলো।
আমাকে যেটা অবাক করলো, সেটা হলো মাইশার অবাক না হওয়া। সে বরং বিষন্ন হয়ে বললো – “আম্মুরও একই ঘটনা হয়েছে। শবে-বরাতের পরদিন সকাল থেকে আয়নাতে নিজেকে দেখতে পাচ্ছে না।”
“বলো কি?” – কিছুক্ষন তার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলাম আমি – “কিন্তু উনি তো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। কোনোদিন তাহাজ্জুদ মিস দেন না।”
মাইশা তার গাঢ় কালো ভ্রূ-জোড়া কুঁচকালো – “নামাজের সাথে এর কি সম্পর্ক?”
প্রশ্নটা শুনে আমি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইলাম, কোন উত্তর দিতে পারলাম না। খালাম্মার কথা মনে পড়লো। তার ঘরে ঢুকলেই কোরআন তেলাওয়াতের শব্দ শোনা যেতো। নিয়মিত মেয়েদের হালাকাগুলোতে যেতেন। বাসায় গেলেই মাথায় হাত রেখে বলতেন – “নামাজটা কখনো মিস দিও না, বাবা।”
আমি নড়ে-চড়ে বসলাম – “না, কোন সম্পর্ক নেই।” – একটু ভেবে বললাম – “কিন্তু তোমাদের সবকিছু চলছে কিভাবে তাহলে?”
“কিভাবে আর চলবে? তার চুল আঁচড়ে দিচ্ছে অন্য কেউ। কাপড় নিয়ে তো সমস্যা নেই।”
সেই রাতে বাসায় এসে অন্ধকারে বসে থাকলাম অনেকক্ষণ। রাতে বার বার ঘুম ভেঙে গেলো। দু’দিন পর ছিল জুমাবার। আমাদের পাড়ার মসজিদ মার্কেটের ওপর ছয়তলাতে, অনেকক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থেকে লিফটে উঠলাম। লিফটের ভেতর নয়জন মুসল্লি ছিল, তাদের মধ্যে তিনজনেরই কোনো প্রতিচ্ছবি আয়নায় দেখা যাচ্ছিল না। মসজিদে গিয়েছিলাম মন থেকে সমস্ত দ্বন্দ্ব ঝেড়ে ফেলার জন্য, ফিরে এলাম দ্বিগুন ধাঁধা নিয়ে।
সেদিনের পর থেকে আমার নেশা হয়ে গেলো রাস্তা-ঘাটে, দোকানে-পাটে, ঘরে-বাইরে খেয়াল করা কাদের ছায়া আছে, কাদের ছায়া নেই। আমি শুধু পথে পথে ঘুরি আর বুঝতে চেষ্টা করি কার প্রতিবিম্ব দেখা যায় না, কড়া রোদের ভেতর কার ছায়া মাটিতে পড়েনা। আমি শুধু বুঝতে চেষ্টা করি আর ব্যর্থ হই, বুঝতে চেষ্টা করি আর ব্যর্থ হই, তবু হাল ছাড়ি না, এই গবেষণাতে লেগে থাকি এমনভাবে যেন এর ওপর আমার জীবন-মরণ, আমার অস্তিত্ব-অনস্তিত্ব, আমার অর্থ-অনর্থ সব নির্ভর করছে।
কিন্তু যত দেখি, তত আমার মাথায় তত বেশি করে জট পাকিয়ে যায়। বিশেষ করে বহুলোক যারা নামাজ পড়ে না, রোজা রাখে না, তাদের দেখলাম দিব্যি ছায়া আছে। তাহলে কি ধর্মে অনাস্থা তাদের শুধুই লোকদেখানো একটা ছল? যেদিন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ডক্টর মুর্তজার ছায়া দেখলাম, সেদিন তো আমার রীতিমতো ভিরমি খাবার অবস্থা, কারণ এই গত বছরই উগ্র গোষ্ঠীগুলো তাকে মুরতাদ ঘোষণা করেছিল, এমনকি বাংলা একাডেমির বইমেলাতে দাও-কুড়াল নিয়ে তাকে তাড়াও করেছিল।
এর কি মানে, আমি জানি না। বহু বছর ধরে আমি মানুষদের দেখেছি – কার ছায়া আছে, কার ছায়া নেই, কার প্রতিচ্ছবি দেখা যায়, কারটা যায় না। তাহলে কি প্রতিচ্ছবিগুলোকে নিয়ে না ভেবে আমার উচিত ছিল মানুষগুলোকে নিয়ে ভাবা? নাকি মানুষগুলোরও পেছনে আরেকটা কিছু ছিল, যেটার দিকে আমি এতদিন তাকাইনি? আমি জানি না। সত্যিই জানি না।
কিন্তু প্রত্যেকটা নেশারই একটা মূল্য থাকে, আমাকেও আমার এই অদ্ভুত নেশার জন্য কড়া মূল্য দিতে হলো। মাইশা বারবার আমাকে ফেরাতে চেষ্টা করেছে, সে বলেছে – “মুশফিক, ছায়া-প্রতিবিম্ব এসব নিয়ে তোমার এত চিন্তার কি আছে? আমি তো তোমার ছায়া নেই বলে তোমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছি না। আর কি চাও তুমি, বলো?” কিন্তু আমি তাকে বলতে পারি নি, আমি কি চাই। আর বলবোই বা কিভাবে, আমি যে নিজেই জানিনা আমি কি চাই? কি সেই প্রশ্ন, যার উত্তর আমার জানা লাগবেই কিন্তু আমি এই পৃথিবীর রাজপথগুলোতে সেই উত্তর খুঁজে পাওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখছি না।
শেষ পর্যন্ত যা হওয়ার, তাই হলো। আড়াই বছর চেষ্টার পর মাইশা আমার ওপর আশা ছেড়ে দিলো। আমার সাথে সে যোগাযোগ বন্ধ করার মাস তিনেক পর একদিন মৌচাক মার্কেটে মাইশাকে দেখেছিলাম, তাকে সুখীই মনে হলো, যদিও আমার তখন এসব কিছুতে কিছু আর যায়-আসে না। ঘটনার পরিক্রমায় আমি একসময় এমনকি চাকরিটাও হারালাম। কোন মালিক বছরের পর বছর ধরে পালবে এক উদ্দেশ্যহীন পথচারীকে!
যেদিন চাকরিটা চলে গেল, আমার মন খারাপ হলো না, শুধু খুব ক্লান্ত মনে হলো। অনেকদিন ধরে পথ চলার পর গন্তব্যে পৌঁছালে মানুষের মনে শান্তি থাকে, কিন্তু শরীরে থাকে ক্লান্তি – সে ধরণের ক্লান্তি অনেকটা। বাসায় ফিরে না খেয়ে ঘুমিয়ে গেলাম। ঘুম খুব গাঢ় হলো, আর সেই স্বপ্নে দেখলাম আবার আমার প্রতিচ্ছায়াকে – অনেকদিন পর দেখলাম তাকে। মজার ব্যাপার হলো, সে আজ আর আমার সাথে বেয়াদবি করলো না, ভদ্রলোকের মতো সৌজন্য করে কুশল জিজ্ঞেস করলো – “ভালো আছেন, জনাব?”
“হ্যাঁ, ভালো আছি। এতদিন পর হঠাৎ? কি মনে করে?”
“স্যার, আমাকে মাফ করে দিয়েন, স্যার।” – বিনীতভাবে বললো আমার হারিয়ে যাওয়া প্রতিবিম্ব আমাকে।
আমি বিজয়ের হাসি হেসে উঠলাম আমার সেই ভুতুড়ে স্বপ্নের ভেতর – “ও, তাহলে তুই স্বীকার করতে এসেছিস, আমি আছি আর তুই নেই?”
“ঠিক তা না, স্যার। কিন্তু অনেক ভেবে-চিনতে মনে হয়েছে, আপনি থাকলেও থাকতে পারেন। আমি আসলে জানি না।”
ওর উত্তরে হতাশ হলাম, কিন্তু তাকে ধমক দিতে যাওয়ার আগেই ঘুমটা চট করে ভেঙে গেলো। চোখ মেলে বোঝার চেষ্টা করলাম ভোর হয়েছে কিনা। তবে সে রাতের পর অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটলো। যখন পরদিন সকালে বাসা থেকে বের হয়েছি, গ্রীষ্মের তীব্র রোদের ভেতর মাটির দিকে তাকিয়ে ছায়া ধরণের একটা কিছু যেন দেখতে পেলাম। বাসায় ফিরে কৌতূহলবশত চলে গেলাম বাথরুমে, আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখলাম মুখে বেশ কয়েকদিনের কাটা কাটা দাঁড়ি গজিয়েছে। কয়েক মুহূর্তের জন্য থমকে গেলাম আমি, কারণ ততক্ষনে সম্পূর্ণ নতুন এক প্রশ্ন গ্রাস করে নিয়েছে আমাকে, শেভিং রেজারটা কোথায় রেখেছি যেন?
