আমার আড়াই তলার ফ্ল্যাটে একটা ইঁদুর ঢুকেছে।
দ্বিধা? সন্দেহ? হতে পারে।
নাখালপাড়ার ছয়তলা এপার্টমেন্ট বিল্ডিঙের আড়াই তলায় ছোট্ট একটা ঘরে আমি থাকি। দ্বিতীয় আর তৃতীয় তলার মাঝখানে পড়েছে বলে ঘরে কোন জানালা নেই, লিফটের দরজা দিয়ে সরাসরি ঢুকে পড়তে হয়, তবে ঘরের ভেতর অপার্থিব একটা আলো থাকে দিন-রাত চব্বিশ ঘন্টা। ওই ঘরটাতেই কেমন করে যেন ঢুকে পড়েছে একটা ইঁদুর।
সন্দেহ? হতে পারে, এটা একটা সন্দেহ।
অনেক কিছু নিয়েই আমার সন্দেহ আছে – আইডিয়াল হাই স্কুলে যা পড়িয়েছে তা নিয়ে সন্দেহ, কাটাবন মসজিদে যে ধর্মচর্চার কথা বলে তার ভেতর ঈশ্বর-বিশ্বাসের অংশ নিয়ে সন্দেহ, ফার্স্ট ইয়ারে পড়ার সময় যে দলের হয়ে রাস্তায় মিছিলে নেমেছিলাম তাদের উদ্দেশ্য আর দেশপ্রেম নিয়ে সন্দেহ, বাবা-মা আমাকে ভালোবাসে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ, এরকম আরো কত সন্দেহ আর দ্বিধা!
সত্যি কথা বলতে কি, মাঝে মাঝে আমার নিজের অস্তিত্ব নিয়েও সন্দেহ হয় – “আমি” বলতে আদৌ কি কেউ আছে? দেকার্তে অবশ্য বলেছিলেন – আমি যে চিন্তা করছি, এটাই তো প্রমাণ যে আমি আছি।
সলিমুল্লা হল থেকে সরকারি দলের লোকজন যেদিন আমাকে বের করে দিল, সেদিন সারাদিন পিঠে একটা পুটলি আর হাতে চামড়া ওঠা কালো একটা সুটকেস নিয়ে সারা ঢাকা শহর চষে বেড়ানোর পর সূর্যাস্তের ঠিক পর পর – যে সময়টায় মানুষের সন্ধ্যাভ্রম হয়, চেনা গলিকেও অচেনা পথ মনে হয় – এই এপার্টমেন্ট বিল্ডিংটা খুঁজে পেয়েছিলাম।
টিনের একটা কালো সাইনবোর্ডে সাদা রং দিয়ে কাঁচা হাতে লেখা ছিল – “এখানে ব্যাচেলরদের বাসা ভাড়া দেয়া হয়।” আমার মনে হলো – আমি যেন মরুভূমিতে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়ে বেড়ানো এক একাকী মুসাফির, যে বহুদিন পর খুঁজে পেয়েছি অদ্ভুত এক মরুদ্যান। কিন্তু সাদা পাঞ্জাবি পরা সফেদ দাড়িওয়ালা বৃদ্ধ বাড়িওয়ালা অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন – “আজকে তো কোন ঘর খালি নেই, বাবা। গতমাসেই সব ঘরে লোক উঠে গেছে।”
“তাহলে এই সাইনবোর্ড কেন লাগিয়ে রেখেছেন?” – কণ্ঠে হতাশা ঢাকতে না পেরে বলে উঠলাম আমি।
“ভুল হয়ে গেছে, বাবা। আমি এখনই ওটা নামিয়ে নিচ্ছি।”
আমি চট করে তার দুর্বল হাত দু’টো ধরে ফেললাম – “চাচা, আমার যাওয়ার কোন জায়গা নেই। এ শহরে আমি বড় একা।”
আমার ভুল হলো কিনা জানি না, মনে হলো পুরাতন আমলের মোটা ফ্রেমের কালো চশমার আড়ালে তার ছানি পড়া চোখ দু’টো একবার হেসে উঠলো। “এই দুনিয়াতে সবাই একা, তারা মায়ের কোলে আসে একা, তারা কবরের গর্তে যায় একা, মাঝখানে কয়েকদিন সমাজ-সমাজ অভিনয় করে, এই আর কি!”
“চাচা, আমাকে ওরা আজকে হল থেকে বের করে দিয়েছে। কোন ব্যবস্থা কি করা যায় না? ডাবলিং? ট্রিপলিং? সাবলেট? চাচা, আপনার চেহারা আমার বাবার মতো।”
শেষ কথাটা তাকে মনে হয় স্পর্শ করলো, একাকিত্ব সম্পর্কে তার নিজস্ব তত্ত্ব স্বত্ত্বেও। তাকে একটু দ্বিধাগ্রস্থ মনে হলো, আমার চোখ থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে প্রায় শোনা যায় না এমনভাবে বললেন – “একটা ঘর …”, তারপর সতর্কভাবে থেমে গেলেন।
“একটা ঘর?” – ফাতনাতে মাছের আঁচ পেয়ে দক্ষ শিকারী যেভাবে বড়শির ওপর বাড়িয়ে দেয় অভিজ্ঞ আঙুলের চাপ, সেভাবে আমি ভদ্রলোককে চেপে ধরলাম।
“বাবা জি, ওখানে সবাই যেতে পারে না।”
“সবাই যেতে পারে না? কিন্তু কেন?”
“ওখানে যেতে হলে সূক্ষ্ম বিষয়ে জ্ঞান আর মনোযোগ দরকার হয়, এই দুনিয়ার বেশির ভাগ লোকেরই এগুলো নেই।” – সন্ধ্যার অদ্ভুত আলোয় তাকে দেখাচ্ছিল দ্বিধান্বিত।
আমি কিন্তু পুরোপুরি সজাগ হয়ে উঠেছি তখন, বললাম – “সূক্ষ্ম বিষয়ে জ্ঞান আর মনোযোগ দুইটাই আমার আছে। সেজন্যই তো আমার কোন বন্ধু-বান্ধব নেই। থাকলে কি আজ আমার এই দুরবস্থা হয়? আমাকে শুধু একবার বলে দেন, কিভাবে ওই ঘরে যাবো।”
রহস্যময় এক হাসি খেলে গেলো পুণ্যবান বৃদ্ধের চোখে-মুখে – “আসলে ওই একটা ঘরই শুধু খালি আছে। সবাই এর খোঁজ পায়না। লিফটে উঠবে একা, দরজা বন্ধ হওয়ার পর দুই আর তিন নাম্বার সুইচ একসাথে চেপে ধরবে, ধরে রাখবে যতক্ষণ না সবগুলো লাইট নিভে গিয়ে লিফটের ভেতরটা পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে যায়। অন্ধকারে যখন চোখ সয়ে আসবে, কিন্তু একাকিত্ব পেয়ে বসবে, তখন দরজা খুলে যাবে। ওটাই সেই গোপন ফ্ল্যাট। ফ্ল্যাটে একটাই ঘর, সেই ঘরটা আমার অন্য বেচেলর কোয়ার্টারগুলোর তুলনায় প্রায় দ্বিগুন, কিন্তু আড়াই তলাতে বলে ওখানে কেউ থাকতে চায় না।”
আমার যাওয়ার কোন জায়গা ছিলোনা, ফলে এ ঘরেই উঠতে রাজি হলাম। ভাড়াও ছিল কম, মাসে মাত্র চার হাজার তিন শো টাকা। লিফটে দুই আর তিন তলার সুইচ একসাথে টিপে ধরে রাখলে আড়াইতলার আমার ফ্ল্যাটের সামনে দরজা খুলে যায়, যদিও প্রথমবার সেই ফ্ল্যাট খুঁজে পেতে আমাকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিল – লিফ্ট হয় তিন তলায় চলে যায়, না হয় দোতলায় বাড়িওয়ালা বৃদ্ধের দরজায় ফিরে আসে।
সেই থেকেই এখানে আছি। তিন বছরের বেশি সময় ধরে আছি। এখান থেকেই তো ভার্সিটি পাশ করলাম, আর পাশ করে বের হবার দিন কয়েকের মধ্যেই আবিষ্কার করলাম, আমার এই ঘরটা একেবারেই ফাঁকা – দিন-রাত অদ্ভুত এক শূন্যতা হাহাকার করে ওখানে। শুধু মাঝে-মধ্যে একটা ন্যাংটা ইঁদুর ঘরটার এক পাশ থেকে অন্য পাশে দৌড়ে চলে যায়। ভীষণ অস্বস্তি তৈরী করার জন্যই বোধহয় সে ওটা করে।
এক বৈশাখের দিনে রোদের ভেতর হাটতে হাটতে মনে হলো, ঘরটা আসবাব-পত্র দিয়ে ভরে ফেলা দরকার। যথেষ্ট জিনিস-পত্রে জায়গাটা ঠাসা-ঠাসি হয়ে থাকলে ইঁদুরটা সম্ভবত আমাকে আর বিরক্ত করবে না, কোন একটা আসবাবের মধ্যে সে তার বাসা করে নেবে – ফলে সেও ভালো থাকবে, আমিও ভালো থাকবো, বাণিজ্যের ভাষায় যাকে বলা যাবে “উইন-উইন” সমাধান। সেই নির্জন তপ্ত দুপুরে কার্জন হলের সামনে দিয়ে হেটে যেতে যেতে আমার সেটাই মনে হলো।
সেদিন থেকে আমার বসবাসের সেই সে ঘরটা পূরণ করতে শুরু করলাম আসবাব-পত্র দিয়ে। ভালোবাসলাম আড়াইতলার আমার এই ঘরটাকে, আর টবের ভেতরকার গোলাপ গাছদুটোকে। ভালোবাসতে চেষ্টা করলাম জানলার পাশের সিঙ্গেল খাটটাকে, যেটাতে শুয়ে আমি মনের চোখে স্মৃতির পাতায় দেখতে পেতাম এক চিলতে আকাশ আর এভাবে প্রতিদিন প্রতিরাতে অসীম আকাশটাও আমার সসীম ঘরের অংশ হয়ে যেত। আর এভাবে বসার চেয়ার, লেখার টেবিল, পুরোনো বইয়ে ঠাসা বুকশেলফ, হলুদ ল্যাম্পও আমার ঘরের অংশ হয়ে গেলো।
এভাবে ঘরে ফার্নিচার ভর্তি করে আমি সুখীই ছিলাম। কিন্তু সমস্যা হলো, যখন এনজিও প্রজেক্টটা শেষ হয়ে গেল। বকেয়া ভাড়া শোধ করতে গিয়ে আমার এত সাধের আসবাবগুলো সব বিক্রি করে দিতে হলো – পড়ার কালো টেবিল, বসার সাদা চেয়ার, বইয়ের তাক, ল্যাম্প, সব। আমার দুঃখে দুঃখী হয়েই কিনা কে জানে, গোলাপ গাছটাও একরাতে গেলো মরে – পিতাজি আদম থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত আমার যত পূর্বপুরুষ মাটির নিচে শুয়ে আছেন, সবার কথা একসাথে মনে করিয়ে দিয়ে ঝরে পড়লো তার সবগুলো পাতা এক রাতের ভেতর।
কিন্তু ঘর আসবাবশূন্য হয়ে যাবার সাথে সাথে আবার সে ঘরে ভীষণ অস্বস্তি হয়ে মাঝে-মধ্যেই আবার উঁকি দিতে শুরু করলো ছোট অস্থির ধূসর রঙের সেই ইঁদুরটা।
দ্বিধা? হতে পারে।
আমি ততদিনে বুঝে ফেলেছি, আসবাব-পত্র, যন্ত্র-পাতি, বই-পত্র, গান-বাজনা ওই ইঁদুরকে দূর করার জন্য যথেষ্ট না। আমার দরকার একজন সাহায্যকারী, একজন সঙ্গী, যার সাথে মিলে আমি ব্যবস্থা করতে পারবো এই ইঁদুরের।
কাকতালীয়ভাবে (যদিও ইউং বলেছেন পৃথিবীতে কাকতালীয় বলে কিছুই নেই) এরপরই ঘটলো সেই ঘটনা, তোমার সাথে দেখা হলো আমার। আমাদের ছোট্ট গবেষণা প্রজেক্টের ডাইনিং রুমে তুমি যখন আমার সাথে দুপুরের খাবার খেতে খেতে অনেক গল্প করতে, আমার দিনটাই সুন্দর হয়ে যেত। আমার ব্যক্তিগত আড়াই তলায় ফিরে এসেও ভাবতে থাকতাম তোমারি কথা।
কিন্তু তুমি ছেড়ে দেয়ার পাত্রী ছিলে না, তুমি আমাকে এ নিয়ে কথা শুনিয়েই যেতে থাকলে, অর্থাৎ তুমি বিশ্বাসই করতে চাইলে না, আমার মতো অপাত্রে ওরকম একটা ব্যক্তিগত ঘর থাকতে পারে। তখন থেকে আমার মাঝে জেদ চেপে গেলো, ভাবলাম তোমাকে দেখিয়ে দেব সেই ঘরের অস্তিত্ব। পরদিন আমার আমন্ত্রণে যখন আবার সেই এপার্টমেন্ট বিল্ডিঙে তুমি এলে, তোমাকে সিঁড়ির বদলে নিয়ে গেলাম লিফটে। দুই আর তিন নাম্বার বোতাম চেপে ধরলাম শক্ত করে। যখন লাইট নিভে গেল, তুমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলে। চিৎকার করে আমার থেকে দূরে সরে গেলে, যেন আমার এই অন্ধকার তোমাকে আস্ত গিলে খেয়ে ফেলবে। কিন্তু তখনি আবার দরজা খুলে গিয়ে তীব্র আলোতে তোমার চোখ ধাঁধিয়ে গেলে তোমার ভেতর স্বস্তি ফিরে এলো।
আমি তোমার এই পরিবর্তনগুলো না দেখার ভাণ করে বললাম – “আমি সুযোগ পেলেই এই ফ্ল্যাটে এসে লুকিয়ে থাকি। লুকিয়ে লুকিয়ে বই পড়ি। না হয় চিন্তা করি। কেউ জানে না। আমিই শুধু জানি। প্রায়ই আসি আমি এখানে। বিশেষ করে মন খারাপ থাকলে, আর তোমার ওপর রাগ হলে তো কথাই নেই।”
আমার ঘর কিন্তু তোমার ভালোই লাগলো। এতই ভালো লাগলো যে তুমি নিয়মিত আমার ঘরে আসতে শুরু করলে। তোমার ভালো লাগলো, কারণ এ ঘরে এমন অনেক কিছু তুমি খুঁজে পেলে যা একসময় তোমার নিজেরও পছন্দ ছিল – হুমায়ুন আহমেদের মিসির আলী, সত্যজিৎ রায়ের ফেলুদা, রকিব হাসানের তিন গোয়েন্দা, আন্তন চেখভের ছোট গল্প, এব্বা আর বিজিসের ইংরেজি গান, ব্রাজিলের ফুটবল দলের হলুদ-সবুজ ফ্ল্যাগ, আরো কত কি! প্রতি শনিবার বিকেলে তুমি আসতে, আধো-অন্ধকার সেই আড়াই তলা জুড়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ঘুরে-ফিরে বেড়াতে – কখনো হালকা সবুজ শাড়িটা পরে, মাঝে মাঝে শাড়ি ছাড়া।
সেরকম এক বিকেলেই তুমি কথাপ্রসঙ্গে আমাকে বললে সুখী হওয়ার মূলমন্ত্র। তুমি বললে – একদিন তোমার অনেক টাকা-পয়সা হবে, বছর বছর বাড়িভাড়া বেড়ে যাওয়া নিয়ে তোমার বাবা যে রকম পেরেশানিতে থাকে সেরকম উৎকণ্ঠা থেকে মুক্ত হয়ে জীবন কাটাতে পারবে তুমি, আর সেদিনই তুমি হবে সুখী আর পরিপূর্ণ হবে তোমার জীবন। কিন্তু আমি একমত হতে পারলাম না তোমার সাথে। আমার ধারণা ছিল – মানুষ কোনোদিন এই পৃথিবীতে সুখী হতে পারবে না, কিছু একটা নেই এই পৃথিবীতে। যদিও আমি জানতাম না, কি সেই “কিছু একটা” জিনিস।
দ্বিধা? সন্দেহ? হতে পারে।
আমি শুধু জানতাম, আমি সেই “কিছু একটা” থেকে বিচ্ছিন্ন, আর জন্মের মাধ্যমেই শুরু হয়েছিল আমার সেই বিচ্ছেদ। সেদিক থেকে চিন্তা করলে, ওই বিচ্ছিন্নতা প্রায় পুরোপুরি জেনেটিক – আমার ডিএনএ-সংশ্লিষ্ট কোন জন্মগত বৈশিষ্ট্য। আর এসবই ইঙ্গিত করে যে, মৃত্যুর মাধ্যমেই এই যন্ত্রণার একটা অবসান হলেও হতে পারে – কোন একদিন।
“তোমার মতো লোক তাহলে কিসে সুখী হবে?” – গোলাপি ঠোঁটের কোণে হাসি লুকিয়ে রেখে জানতে চেয়েছিলে তুমি।
“ইঁদুরটা ঘর থেকে উধাও হলে।” – অন্যমনস্কভাবে বলেছিলাম আমি – “খুব বিরক্ত করছে ওটা আমাকে, কিছুতেই পিছু ছাড়ছে না। কেমন করে যেন বার বার আমাকে খুঁজে পায় ওটা।”
“ইঁদুর?” – সে মনে হলো আঁতকে উঠেছে। অবশ্য ভয় পাওয়াটাই স্বাভাবিক, কে পছন্দ করবে এরকম একটা বোধ ঘরে ছাইরঙা ইঁদুরের দৌড়াদৌড়ি!
“গত কয়দিন হয়, আমার আড়াই তলার সেই ফ্ল্যাটে একটা ইঁদুর ঢুকেছে। দ্বিধা? সন্দেহ? হতে পারে।” – বললাম আমি।
“ট্র্যাপ দিয়ে ধরছো না কেন ওটাকে?”
“জানি না কেন। মনে হয় মায়া পড়ে গেছে।”
আর কি আশ্চর্য, ইঁদুরের কথা বলতে না বলতেই সে আমাদের সামনে দিয়ে দৌড়ে চলে গেলো, তারপর ঘরের কোণে বসে কুটকুট করে কি যেন কামড়াতে লাগলো, আমি প্রায় চিৎকার করে বলে উঠলাম – “ওই যে, ওই যে।”
তুমি ভয় পেয়ে চেয়ারের ওপর দুই পা তুলে বসলে, কিন্তু তোমাকে দেখে মনে হলে না তুমি ইঁদুরটা দেখতে পেয়েছো। তুমি বললে – “কোথায়?”
“ওই যে ঘরের কোণে বসে আমাদেরকে দেখছে।”
“কোথায়? তুমি কি আমাকে ভয় দেখাচ্ছো?”
অনেক চেষ্টা করেও তোমাকে ইঁদুরটা দেখাতে পারলাম না, আশ্চর্য ! অথচ পুরোটা সময়ই সে তার নৈশভোজ চালিয়ে যাচ্ছিলো আর মাঝে-মধ্যে বিন্দুর মতো কালো দুটো কুতকুতে চোখে আমার দিকে তাকাচ্ছিলো।
ওটাই ছিল আমার ফ্ল্যাটে তোমার শেষবারের মতো আসা। হয় তুমি ইঁদুর ভয় পেতে, অথবা তুমি ভেবেছিলে আমার মাথা খারাপ। যেকোন কারণেই হোক না কেন, এরপর থেকে তুমি হঠাৎ করেই আমার বাসায় আসা বন্ধ করে দিলে। আমি সহজভাবেই নিয়েছিলাম ব্যাপারটা। এই পৃথিবীতে অনেকেরই ইঁদুর অপছন্দ।
এভাবে তুমিও একদিন আমার মনের ঘর থেকে পালিয়ে গেলে দূরে কোথাও। তুমি তোমার বিয়ের কার্ড হাতে নিয়ে হাসি হাসি মুখে খবরটা বললে যেদিন, সেদিন থেকে আবার, আরেকবার, আমার মনের ঘরে উপদ্রব শুরু করলো নচ্ছার সেই ইঁদুর।
কিন্তু এইবার আমি ছিলাম সাবধান। জহিরের কাছ থেকে টাকা ধার করে নিজের ঘরের জন্য কিনে আনলাম বিশাল এক আয়না, যেন নিজের ছবি ছাড়া আর কিছুই আমাকে দেখতে না হয় – আয়নায় শুধু আমি নিজেকে দেখবো, নিখুঁত এক নার্সিসিস্টের মতো নিজেকেই শুধু নিজে ভালোবাসবো, স্বার্থপরতার কারণে এমনকি ভুলে যাবো মেঝেময় দৌড়াদৌড়ি করতে থাকা ভীষণ একাকী সেই ইঁদুরটার কথাও।
কিন্তু এই কৌশলও বেশিদিন কাজ করলো না – এক মেঘলা সন্ধ্যায় অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, আয়নার ওপাশের মানুষটা আসলে আমি নই। প্রথম কয়েকদিন আয়নায় দেখলাম আমার মৃত বাবার ছবি, কয়েকদিন মা-কেও যেন দেখলাম, এমনকি একদিন নিজের প্রতিচ্ছবির জায়গায় দেখতে পেলাম কবি নির্মলেন্দু গুনকে। আতংকিত হয়ে আয়না সরিয়ে ফেললাম ঘর থেকে। বুঝতে পারলাম না, আয়নায় কেন আমি নিজের ছবি দেখতে পাচ্ছি না।
সন্দেহ? হতে পারে।
সেই থেকে ঘরে থাকা একেবারেই কমিয়ে দিলাম আমি, পালিয়ে বেড়াতে শুরু করলাম নাখালপাড়া থেকে। সারাদিন ঘোরা-ফেরা করি প্রাচীন ঢাকা শহরের পথে-প্রান্তরে, সারারাত ধোঁয়া-ওঠা ওষুধের নেশায় ডুবে থাকি চোখ গর্তে ডুবে যাওয়া সায়রা মেয়েটার সাথে। ঘরের ইঁদুরটাকে একেবারেই পাত্তা দিই না, দিনের পর দিন হতাশ করতে থাকি তাকে। ততদিনে আমি বুঝে ফেলেছি, ইঁদুরকে শায়েস্তা করার সত্যিকার উপায় হচ্ছে তাকে পুরোপুরি উপেক্ষা করা।
কিন্তু ইঁদুরের দৌড়াদৌড়িতে নিজেকে অভ্যস্ত করতে পারলেও সহ্য করতে পারছিলাম না উদ্দেশ্যহীন জীবন কাটানো। সেরকম এক ভোর রাতে ভাবছিলাম, কেমন হয় যদি ধ্বংস করে দেই এই ঘর? কেউ তো জানবে না। বাড়ি ওয়ালাও প্রমান করতে পারবে না আমার সহিংসতা। যার অস্তিত্ব নিয়েই সন্দেহ আছে, তার আবার বিনাশ কি!
এসব যখন ভাবছি, আমার আড়াইতলার সস্তা ফ্ল্যাটে বসে, হঠাৎ মনে হলো তীব্র ভীষণ একটা আলো আসছে আয়নার ভেতর থেকে। ছিটকে পিছিয়ে এলাম ওটার কাছ থেকে। ভয় পাই নি, কিন্তু মনে হয়েছে ওই আলোকে দেখার মতো শক্তি আমার চোখের নেই। মনে হয়েছে ওই আলোর দিকে তাকালে আমি অন্ধ হয়ে যাবো, যেটা ওই মুহূর্তে আমি হতে চাই নি।
দ্বিধা? সন্দেহ? মনে হলো না। বরং মনে হলো, এমন পরিষ্কার দৃশ্য জীবনে কোনোদিন দেখিনি আমি – যা আজ দেখলাম নাখালপাড়ার এক আড়াই তলায় আমার ব্যক্তিগত ঘরে। যদিও বুঝতে পারলাম না এই আলো কি ঈশ্বরের ছায়া, নাকি প্রকৃতির খেয়াল।
সেই ভোররাতে ভেবে ভেবে অস্থির হয়ে গেলাম, কে হতে পারে আমার দৃষ্টিশক্তির বাইরের সেই স্বত্বা। সেই শেষরাতে আমার চিন্তার ওই অস্থিরতা আমাকে ব্যতিব্যস্ত করে রাখলো, ফজরের আজান কানে যাবার আগ পর্যন্ত। সে রাতে কেমন করে যেন রাত ভোর হওয়ার আগেই নিশ্চিত হয়ে গেলাম, এই পৃথিবীতে আমি একা নই – এমনকি আমার শূন্য ঘরের ভেতরও আমি নিঃসঙ্গ নই।
সেই দিনের পর থেকে – সেই ভোর রাতে আয়নার ওপাশে তীব্র বিশুদ্ধ আলোর একটা ছায়া দেখার পর থেকে – কোন এক অজানা কারণে, আজ পর্যন্ত ইঁদুরটাকে আর মনের ঘরে দেখিনি। যেমন শূন্য থেকে হঠাৎ উদয় হয়েছিল, ঠিক তেমনি আবার রহস্যজনকভাবে শূন্যে উধাও হয়ে গিয়েছিলো সেটা চিরতরে আমার জীবন থেকে।

wow!! 65একটি আয়নার জন্ম ও প্রায়-মৃত্যু সমাচার
LikeLike